কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

ফলের সালতামামি

বারো মাসে বারো ফল না খেলে যায় রসাতল। ফল খাওয়া দরকার বোঝা গেল কিন্তু পাব কোথায়? যদিও ফল ভুবনে অনেক আমদানি নির্ভর বাংলাদেশে ১২ মাসে ১২ ফল কেন তার চেয়েও বেশি সংখ্যক ফল আমাদের বাহারি ফলের দোকানে রসে টলমল করে ঝুলছে আর ক্রেতাদের আকর্ষণ করছে বছরের প্রতিটি দিন। ফলের মৌ মৌ গন্ধে মাতোয়ারা করে পথচারীকে। আমরা যদি আমাদের নিজেকে প্রশ্ন করি বিদেশি ফলের বাজার এত চড়া কেন? এত জনপ্রিয় তথা প্রধান বিবেচনা প্রসূত কেন? কোনো সদুত্তর পাওয়া যাবে না। বরং বিজ্ঞাপনের মতো বলতেই হয় এমনিতে এমনিতেই খাই।
সৎ সাহস নিয়ে বলা যায়, আমরা অনেকেই পুষ্টির জন্য ফল খাই না। ধারণাটি এমন সবাই খায় আমরাও মৌসুমে মৌসুমে ফল খাই। কিন্তু প্রশ্ন আসে এদেশে প্রচলিত ও অপ্রচলিত মিলিয়ে যে শতাধিক রকমের ঐতিহ্যবাহী ফল পাওয়া যায় তার কোনোটিই পুষ্টিতে তুষ্টিতে গুণেমানে কম নয়, ফেলে দেয়ার মতো নয়। শুধু দাম দেয় না বলে দাম পায় না। মুরব্বিদের কাছে শোনা যায় আগেকার দিনে এত বেশি ফল পাওয়া যেত যে, খেয়ে শেষ করা যেত না। গাছের নিছে পড়ে পচে থাকত। হ্যাঁ বিশ্বাস করতেই হয়। ফল বেশি মানুষ কম সুতরাং খেতে পারতেন বেশি। আর পুষ্টিসমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী কাক্সিক্ষত পরিমাণ ফল খেয়ে তারা দেহে, চেহারায়, শক্তিতে, সুস্থতায়, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন। রোগশোকে কম ভুগতেন। এখন আর সে রকম নয় আমরা সে রকম নই বলে। আমাদের জনপ্রতি দৈনিক ৩৫ থেকে ৪৫ গ্রাম হারে বার্ষিক মোট প্রয়োজন প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ মেট্রিক টন। উৎপাদন হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ লাখ মেট্রিক টনের মতো। এখনও আমাদের বছরে ফল ঘাটতি ২৫ লাখ মেট্রিক টনের ওপরে।
 
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফল বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. এম এ রহিম জানান বাংলা বছরের বৈশাখ-শ্রাবণ এ ৪ মাসে আমাদের মোট উৎপাদিত ফলের ৫৬ শতাংশ পাওয়া যায়। আর বছরের বাকি ৮ মাস অর্থাৎ ভাদ্র-চৈত্র মোট ফলের ৪৬ শতাংশ পাওয়া যায়। অর্থাৎ বছরের কিছু সময় অতিপ্রাপ্যতা এবং বেশি সময় প্রাপ্তির স্বল্পতা। কিন্তু এ কথা তো ঠিক যে, বছরের এমন কোনো মাস নেই যে যখন বাজারে কোনো ফল পাওয়া যায় না। কিন্তু একবারে ফলবিহীন কোনো মাস নেই বাংলার বর্ষপঞ্জিতে বা ষড়ঋতুতে। ইচ্ছে করলেই বছরের প্রতিদিন প্রতি বেলায় আমরা ফল খেতে পারি অনায়াসে। বছরের প্রতিটি দিন কিছু না কিছু ফল পাওয়া যাবেই। হয়তো অনাগত ভবিষ্যতে আমাদের ফল বিজ্ঞানীরা এমনভাবে ফলের জাত উদ্ভাবন করবেন যেন বছরের সব সময় সমান হারে মৌসুমভিত্তিক ফল পাওয়া যাবে। তাছাড়া বছরব্যাপী ফলের প্রাপ্যতা, সুষ্ঠু বিতরণ, মাসভিত্তিক উৎপাদন কৌশলসহ সব অন্যান্য কৌশলাদি আবিষ্কার করবেন। কিন্তু চলমান সময়ে আমাদের বহুমুখী দৈন্যতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে বেশি ফল খাওয়া দরকার, যা আছে নিজেদের তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা দরকার। ভাবতেই কষ্ট হয় এখনও আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় কোনো মেহমান কোথায়ও বেড়াতে গেলে আপেল আঙুর কমলা নিয়ে গেলে যেমন কদর পায় অন্যান্য দেশি ফল নিয়ে গেলে তেমন কদর বা দাম পায়না। জাম, জামরুল, কদবেল, ডেউয়া, ডেওফল, লুকলুকি, আতা, শরিফা, কাউ, ক্ষুদিজাম, কামরাঙা, বিলিম্বি, করমচা, চালতা, গাব, অড়বরই জলপাই এসব নিয়ে কেউ বেড়াতে গেলে ধুয়ো ধ্বনী দিয়ে তাকে অপমান করবে। কবে আমাদের এ হীনমন্যতা দূর হবে। ...বাড়ির পাশে আরশিনগর সেথা পরশি... বসত করে ...আমি একদিন না দেখিলাম তারে...
ফলভিত্তিক কৌশল
জানা মতে, এ যাবত প্রচলিত অপ্রচলিত মিলে শতাধিক ফলের জাত উদ্ভাবিত হয়েছে (বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট,  বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বিএসএমআরইউসহ অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠান মিলে উদ্ভাবন করেছেন)। যা এ দেশের চাহিদা প্রাপ্তি প্রয়োজনের জন্য নেহায়েত কম নয়। গুণেমানে ভরপুর এসব ফল আবাদ করে উৎপাদন করে খেয়েও আমাদের দৈন্য কেন কমেনি তার কারণ উদ্ঘাটন করা গেল না আজ অবধি। আমাদের ভাবতে হবে এখন পর্যন্ত এদেশের মোট উৎপাদিত ফলের মাত্র ৩০ শতাংশ আসে পরিকল্পিত বাগান থেকে। আর বাকি ৭০ শতাংশ আসে বসতবাড়ির আঙিনায় স্থাপিত অপরিকল্পিত ফলবীথি থেকে। তাহলে একথা স্পষ্ট হয়ে গেল আমরা যদি আসল অর্থে দেশের ফল ভুবনকে সমৃদ্ধ করতে চাই তাহলে বসতবাড়িভিত্তিক ফল বাগানকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা বাণিজ্যিক বাগানভিত্তিক ফল বাগান প্রতিষ্ঠা করা আমাদের অনেকের পক্ষেই সম্ভব না। কিন্তু এমন কোনো বসতবাড়ি নেই যেখানে দু-চারটি ফল-ফলাদির গাছ না আছে। আমরা তো জানি সে কবিতার মতো... আম গাছ জাম গাছ বাঁশ গাছ যেন মিলে মিশে আছে ওরা আত্মীয় হেন..। না বাগান স্থাপন করতে দূরত্বের ব্যাপারে গায়ে গায়ে লেগে থাকা গা-ছোঁয়া পদ্ধতি অনুসরণ করলে চলবে না। বরং চাহিদা প্রয়োজনীয়তা হিসাব করে নির্দিষ্ট দূরত্বে ফল গাছের চারা পরিকল্পনা মোতাবেক লাগাতে হবে। আমাদের দেশের ২ কোটি বসতবাড়িতে যদি পরিকল্পিতভাবে ফলের বাগান স্থাপন করতে পারি এবং প্রাসঙ্গিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারি তাহলে ভাবতে পারি ফলে সমৃদ্ধ করে এদেশটিকে কোথায়  নিয়ে যেতে পারব আমরা?
 
প্রাসঙ্গিকভাবেই বহুস্তরি ফল বাগানের কথা আসে। বসতবাড়ির জন্য যেমন জায়গা বাঁচাতে বহুতল বিশিষ্ট দালানঘর তৈরি জরুরি তেমনি কম জায়গা থেকে নিবিড় আবাদের ম্যাধমে বেশি লাভবান হতে আমাদের খুব দরকার বহুস্তরি ফল বাগান স্থাপন। কেননা এসব বাগানে একই সাথে হরেক রকমের ফল গাছের বাগান তো করা যায়ই উপরন্তু বিভিন্ন স্তরে অন্যান্য গাছের ফসলের সন্নিবেস করে বেশি উপার্জন আয় করা সম্ভব অনায়াসেই। ড. এম এ রহিমের মতে, তিনস্তরি বাগানে নিচু স্তরে ১ মিটার কম উচ্চতা বিশিষ্ট গাছ যেমন আনারস, শাকসবজি, ঔষধি গাছ, আদা, হলুদ, মরিচ, ধনিয়া, কচু, রসুন, পেঁয়াজ; ১ থেকে ৩ মিটার উচ্চতায়  কলা, পেঁপে, পেয়ারা,  লেবু, ডালিম, আতা, শরিফা, কুল এসবের আবাদ করা যায়। ১০ থেকে ১২ মিটার উচ্চতায় কলমের আম, জাম, জামরুল, লিচু, সফেদা এবং ২৫ মিটার উঁচুতে আম, কাঁঠাল, নারিকেল, সুপারি, নিম, শিশু, মেহগনি লাগানো যায়। ফল খেতে হলে ফল পেতে হবে। আর ফল পেতে হলে পরিকল্পিতভাবে ফলের আবাদ বাড়াতে হবে তবেই কেবল আমরা আমাদের চাহিদা অনুসারে ফলের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে পারব।

আমাদের বাউকুল, থাইকুল, কচুয়া কুল, নারিকেলি কুল ঢাকা ৯০ জগৎ সেরা। এদের স্বাদ, গুণমান কোনোটা বিশ্ব বাজারের সাথে তুলনীয় নয়। আমরা জানি, এদেশে কুলচাষ করে লিচু চাষ করে, আম চাষ করে বছরে কোটি টাকা আয় করেছেন অনেকে। তাহলে আমাদের দেশের এসব ফল বিদেশি ফলের সাথে কেন তুলনীয় হবে না। এদেশের লিচুর রঙ স্বাদ, গুণ কোনোটি বিশ্বকে চমক দেয়ার মতো নয়? বাংলার লিচুর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো যখন লিচু পেকে বাজারে আসে তখন সারা বিশ্বে অন্যান্য জনপ্রিয় ফলের তেমন প্রাপ্যতা থাকে না। সুতরাং আমরা আমাদের রসালো লিচু দিয়ে ফলের পৃথিবীকে মাতোয়ারা করতে পারব। প্রয়োজন শুধু আমাদের সম্মলিত কার্যকর প্রচেষ্টার।
 
ফলের পুষ্টিভিত্তিক গুরুত্ব
ফলের গুরুত্ব বা ধারণা আমাদের সবার আছে। কিন্তু আমাদের স্বীকার করতেই হবে ফল খাদ্য পুষ্টি ঔষধিগুণসহ আমাদের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য আবশ্যকীয়। আমাদের প্রায় সব ফলের স্বাদ, গন্ধ, মান, গুণ, পুষ্টি বিশ্বে যে কোনো ফলের চেয়ে কোনো অংশেই কম না বরং বেশি। তাছাড়া অনেক দেশের ক্রেতারা আমাদের দেশের ফলকে দারুণভাবে পছন্দ করে। পুষ্টি বিজ্ঞানীরা বলেন বাংলাদেশের মানুষের জন্য প্রতিদিন মাথা পিছু কমপক্ষে ১১৫ থেকে ১৩৫ গ্রাম ফল খাওয়া দরকার। অথচ আমরা গড়ে খেতে পারছি মাত্র ৪৫ (প্রয়োজনের ৪১ শতাংশ) গ্রাম। মানে মোট প্রয়োজনের মাত্র এক তৃতীয়াংশ। তাহলে এখনও অনেক বাকি। পুষ্টি মিটোতেই আরও বেশি ফলের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। একটি বদ্ধমূল ভুল ধারণার কথা বলি, এ যে পুষ্টির জন্য ১৩৫ গ্রাম ফল প্রতিদিন খাওয়া দরকার তা কিন্তু আমাদের আম, জাম, কলা, লেবু, লিচু, ডেউয়া, লটকন, লুকলুকি, লটকন, কাউ এসব দিয়ে নয়। খেতে হলে খান্দানি বিদেশি ফল খেতে হবে। অথচ আমরা বিশ্বাস করতেই পারি না এদেশের এসব ঐতিহ্যবাহী ফলেরও আছে অনেক বহুমাত্রিক গুণ। শুধু অভ্যাস আর আমাদের হীনমানসিকতা এর জন্য দায়ী। ওই যে ... যেসব বঙ্গতে জন্মে হিংসে বঙ্গবাণী সেব কাহার জন্ম নির্নয় জানি...
লেবুতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন আছে যা আমাদের নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদানের একটি। কিন্তু ভিটামিন সি স্টক করে জমা রাখার কোনো উপায় নেই কিংবা এমন নয় যে একদিন খেলে ১০ দিন চলে যাবে। প্রতিদিনই খেতে হবে পরিমাণ মতো। সেজন্য যদি কারোর বাড়িতে ২ থেকে ১টি লেবু গাছ থাকে তাহলে যে কোনো সময় মন চাইলেই লেবু খাওয়া যায়। এরকম পেয়ারাসহ অন্যান্য কত শত ফলের নাম উল্লেখ করা যায়। সুতরাং খাদ্য পুষ্টি অর্থ এসবের জন্য হলেও ফল নিয়ে আমাদের খুব ভাবা দরকার। আমাদের অপুষ্টি (৭৫% শিশু), অন্ধত্ব (প্রতি বছর ৩০ হাজার যোগ হয়) ক্যালরি (৭৬% পরিবার) সমস্যা, অসুস্থতা, গলাফুলা (১০ মিলিয়ন লোক আক্রান্ত) রোগ, ভিটামিন সি’র (৯৩% পরিবার) জোগানসহ নানা পুষ্টিহীনতায় ফলের গুরুত্ব সর্বাধিক। আমরা সবাই জানি ফলের মূল্য বেশি, ফলন বেশি, আয় বেশি। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ওষুধ শিল্পে অবদান সব ক্ষেত্রে ফলের অবদান গুরুত্ব অন্যান্য ক্ষেত্রের তুলনায় অনেক বেশি।

ফলের জাত ও উৎস
আমাদের এমনিতেই শতাধিক জাতের ফল আছে। আমাদের বিজ্ঞানীরা এরই মধ্যে অনেক ফলের জাত আবিষ্কার করে অবমুক্ত করেছেন যা বিদেশি যে কোনো ফলের সাথে শত ভাগ তুলনীয়। তাছাড়া সময়ক্ষণ বুঝে উৎপাদন কৌশলও সহজ সরলভাবে উদ্ভাবন করেছেন। প্রয়োজন শুধু এসব জাতের কার্যকর বিস্তৃৃতি। দেশব্যাপী যখন ফল উৎপাদনকারীরা ও আগ্রহী কৃষকরা এসব প্রতিশ্রুতিশীল জাতের বীজ-কলম পান তাহলে তারা ফল উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সমৃদ্ধি আনতে পারবেন। গত কয়েক বছর ধরে মাতৃগাছ তৈরি, সম্প্রসারণ, ভালো উৎস খুঁজে জাতের সম্প্রসারণ কার্যক্রম চলছে। এসব কার্যক্রমের গতি বিস্তৃৃতি কৃষকদের প্রয়োজন আর চাহিদা অনুযায়ী করতে পারলে বাজিমাত করা যাবে ফল উৎপাদনে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এ ব্যাপারে এগিয়ে এসেছেন। আমাদের প্রয়োজন শুধু তাদের কাজে যথাযথ গতি বাড়ানো এবং তাদের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করা।
 
ফল উৎপাদন কৌশল
ফলের সর্বাধিক প্রাপ্তির জন্য পরিকল্পিতভাবে ফলের আবাদ বাড়াতে হবে। সে ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত জাত নির্বাচন থেকে চারা তৈরি কলম তৈরি, গর্ত তৈরি, গর্তে প্রাথমিক ও সুষম সারের উপরিপ্রয়োগ, চারা-কলম রোপণ, বেড়া-খাঁচা দিয়ে চারা-কলম রক্ষা, আন্তঃপরিচর্যা, সার প্রয়োগ ও ব্যবস্থাপনা, সেচ প্রদান, অঙ্গ ছাঁটাই, রোগ পোকা ব্যবস্থাপনা, ফল সংগ্রহ এসবের কৌশল পদ্ধতি সহজ সরলভাবেই বিস্তার করার ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হবে। কৌশল অবলম্বন করে উৎপাদন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যেতে পারলে ফলের দেশ বাংলাদেশকে নতুনভাবে পরিচয় করানো যাবে। প্রেক্ষিতে ফলভিত্তিক সমস্যার মধ্যে মানসম্মত কাক্সিক্ষত আধুনিক জাত, অঞ্চলভিত্তিক জাত, অনিয়মিত ফল ধারণ, মৌসুমভিত্তিক ফলের প্রাপ্যতা বিতরণ, বালাইয়ের আক্রমণ, ফল সংগ্রহ উত্তর অপচয়, কৃষকদের অসচেতনতা, বাজারজাতকরণের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বিশেষভাবে ভাবতে হবে এবং জরুরিভিত্তিতে সুষ্ঠু সমাধান বের করে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে।
 
ফল শিল্প
দেশে কত শত শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে প্রতিনিয়ত। সম্ভাবনাবিহীন জনক্ষতিকর কম প্রয়োজনীয় শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অগণিত। অথচ আমাদের অপার সম্ভাবনার ফলের ওপর তেমন কোনো শিল্প কারখানা গড়ে উঠেনি এ বাংলার সীমায়। ফিলিপাইনে শুধু নারিকেলের ওপর কয়েক ডজন কারখানা আছে। নারিকেলের তৈরি অন্তত ডজনেরও বেশি লোভনীয় সুস্বাদু আইটেম দেশে বিদেশে বিকাচ্ছে জনপ্রিয়তার আকর্ষণে। আনারসের মৌসুমে টাঙ্গাইল, সিলেট মৌলভীবাজার, পাহাড়ি অঞ্চলের আনারস চাষিরা পানির দামে আনারস বিক্রি করেন। সে আনারস যখন শহরে আসে ফলের দোকানে স্থান পায় তখন কয়েকগুণ দামে পুষ্ট হয়ে ক্রেতাদের ঘরে আসে। শুধু তাই? হাজার সহস্র টাকার আনারস পচে গলে মাটির সাথে মিশে যায়। একই কথা প্রযোজ্য বরিশালে ও পটিয়ার পেয়ারা, পাহাড়ি লেবু, কাপাসিয়ার ভালুকা জৈনাবাজারের কাঁঠালের ক্ষেত্রেও। ছোট, মাঝারি এবং ক্ষেত্র বিশেষে বড় শিল্পকারখানা গড়ে এসবের নান্দনিক, লাভজনক এবং প্রতিশ্রুতিশীল আয়ের গর্বিত পথের সন্ধান অনায়াসে পাওয়া যায়। জ্যাম জেলি আচার চাটনি কত শত নামের স্বাদের আইটেম তৈরি করে নিজেদেরে খাওয়া চলে দেশীয় বাণিজ্য চলে এবং বিদেশে রফতানি করে অনেক টাকা আয় করা সম্ভব। এত কম দামে শিল্প উপকরণ এবং শ্রমিক বিশ্বের আর কোথাও নেই। সুতরাং পরিকল্পিকভাবে ভাবলে কাজ করলে অগণিত এবং বহুমুখী লাভ আমাদের আসবেই।
ফল সংরক্ষণ প্রক্রিয়াজাতকরণ
মৌসুমে অধিক প্রাপ্যতার জন্য ফল খেয়ে শেষ করা যায় না। এজন্য ফল নষ্ট হয় অনেক। আমরা ইচ্ছা করলেই অতিরিক্ত এসব ফল ভাণ্ডারকে দারুণভাবে কাজে লাগাতে পারি। আমের আমসত্ত্ব, তালসত্ত্ব, কাঁঠালসত্ত্ব এসব ফল দীর্ঘদিন রেখে খাওয়ার যৌক্তিক প্রক্রিয়া। তাছাড়া আমচুর, ফলি আচার চাটনি জ্যাম জেলি মোরব্বা তেল লবণে ভিনেগারে সংরক্ষণসহ কত রকমের সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কৌশল আবিষ্কৃত হয়েছে তার শেষ নেই। আমাদের ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ বিজ্ঞানীরাও নানাবিদ কৌশল উদ্ভাবন করেছেন। এখন প্রয়োজন এসবের প্রচার এবং উপযুক্ত প্রসার। খুব জরুরি দরকার সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা আর কার্যকর আন্তরিকতার সাথে ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের। যথোপযুক্তভাবে আমাদের বাংলার ফলকে উৎপাদন সংগ্রহ সংরক্ষণ প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে বিশ্ব ফল বাজার আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারব। ফলশ্রুতিতে ফলভিত্তিক অর্থনৈতিক আয় সমৃদ্ধি অনেক বাড়বে।
 
ফল প্রচারণা
আমরা তো জানি প্রচারেই প্রসার। ফলসমৃদ্ধ দেশ গড়তে সর্বাধিক প্রচার সর্বোতভাবে চালাতে হবে দেশব্যাপী এবং বছরব্যাপী। প্রিন্ট মিডিয়া, বেতার, টেলিভিশন, আইসিটি, মাল্টি মিডিয়াসহ সব প্রচার মাধ্যমে যদি এক সাথে প্রয়োজন মাফিক সময়োপযোগী প্রচার করা যায় তাহলে ফলভিত্তিক প্রচারণা, স্লোগান, প্রতিপাদ্য, অভিযান সফল হবে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় আঞ্চলিক স্থানীয় ফল মেলা ফল প্রদর্শনী দারুণ সাড়া জাগায়। বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, গবেষক, সম্প্রসারণবিদ, অভিজ্ঞ, বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ফলভিত্তিক প্রয়োজনীয় কমিটি ফোরাম সংগঠন গড়ে তাদের সর্বোচ্চ কাজে লাগাতে হবে। তদারকি মূল্যায়নের মাধ্যমে সময়ে সময়ে কাজের গতি সফলতা পর্যবেক্ষণ করে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ফল কৌশল প্রযুক্তি প্রচারণার জন্য বিভিন্ন আঙ্গিকে ব্যবস্থা নিতে হবে। কখনো সরাসরি ব্যবহারিক পদ্ধতি গান নাটিকা প্রামাণ্যচিত্রসহ বিনোদনভিত্তিক প্রচারণা বেশি ফলপ্রসূ। সুতরাং যারা প্রচারের সাথে সংশ্লিষ্ট তাদের  এসব ভেবে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে।

ফল বাজার
আমাদের কৃষকরা যা-ই উৎপাদন করেন না কেন তার উপযুক্ত দাম পান না বলে পরবর্তীতে উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এর প্রধান কারণ আমাদের বাজারের অব্যবস্থাপনা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এরই মধ্যে প্রমাণ করেছেন কৃষক নিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থাপনা কৃষকদের পণ্য বিক্রিতে লাভ পেতে দারুণভাবে সহায়তা করছে। কৃষি বাজারের সরলিকীকরণ হওয়াতে এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ থাকাতে তারা তাদের বিক্রিমূল্য আগের চেয়ে অনেক বেশি পাচ্ছেন। সুতরাং এ পরিকল্পিত বাজার কৌশল সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে সুষ্ঠুভাবে। সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থা আমাদের কৃষি উৎপাদন উন্নয়কে অনেক বেশি বেগবান ও সমৃদ্ধ করবে। একই সাথে প্রাসঙ্গিকভাবে কর্তন প্রক্রিয়া, গ্রেডিং, প্যাকেজিংসহ সংশিষ্ট কার্যক্রমে যদি আধুনিক এবং মানসম্মত পদ্ধতি কৌশল বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে আন্তর্জাতিক মানে আমরা ফল বাজারে এগিয়ে যেতে পারবো। এ ব্যাপারে হর্টেক্স ফাউন্ডেশনের বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে। সুতরাং তাদের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে তাদের একাজে নেতৃত্বের দায়িত্ব দিতে হবে। তবেই দেশের ফল বাজার আসল অর্থে চাঙ্গা হয়ে উঠবে। কৃষক তার ন্যায্য মূল্য পাবে দেশ সমৃদ্ধ হবে।
 
শেষ কথা
কৃষি প্রধান এদেশে ফলের বাহারে বাংলার ভুবন মাতোয়ারা। আমরা কাছে আছি বলে আমাদের মন বিবেক চেতনায় তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। কিন্তু ভেবে দেখেছি কি? সুষ্ঠু পরিকল্পনা যথোপযুক্ত বাস্তবায়ন কৌশল এবং প্রাসঙ্গিক কার্যক্রম আমাদের ঐতিহ্যবাহী এসব ফল আমাদের কোন আলোর সন্ধানে নিয়ে যেতে পারে? সেজন্য আমাদের সম্মিলিত পথচলা খুব বেশি প্রয়োজন। রাজশাহীসহ সব উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা প্রমাণ করে দিয়েছেন মাঠ ফসলের জমিতেও কি অনায়াসে ফলবীথি গড়ে তুলে অতিরিক্ত লাভ ঘরে তোলা যায়। ফল গবেষণা জোরদারকরণ, দেশব্যাপী মাতৃগাছ তৈরি ও ব্যবস্থাপনা, মানসম্মত চারা কলম উৎপাদন ও বিতরণ, আধুনিক কৌশল অবলম্বন করে ফল উৎপাদন ও ব্যবস্থাপন, মিশ্র ও বহুস্তরি ফল বাগান প্রতিষ্ঠা, ফলের বাজার ব্যবস্থাপনা, ফল রফতানি, ফলভিত্তিক প্রচারণা, ফলভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠা, মেলা, প্রদর্শনী ও প্রশিক্ষণ, ফল হিমাগার স্থাপন এসব করতে হবে সম্মিলিতভাবে পরিকল্পিতভাবে এবং অবশ্যই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে। তবেই ফলভিত্তিক ফল আসবে অনায়াসে আকাক্সক্ষার সীমানা ছাড়িয়ে। ফলের দেশ গড়তে ফল পরিকল্পনা, ফলের জাত উন্নয়ন উৎপাদন, বিপণন এবং সার্বিক প্রচার প্রচারণা যথোপযুক্তভাবে করতে হবে। তবেই কেবল আমরা গর্ব করতে পারব। এবারের ফলদ বৃক্ষ রোপণ পক্ষ ২০১৫ এর প্রতিপাদ্য দিন বদলের বাংলাদেশ, ফল বৃক্ষে ভরবো দেশ। প্রতিপাদ্যকে সফল করতে হলে বিনয়ের সাথে আহ্বান জানানো যায় আসুন দেশীয় ফলের দেশ গড়ি  হাতে হাত ধরি ধরি।
 

কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম*

* উপরিচালক (গণযোগাযোগ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫ subornoml@gmail.com

Share with :

Facebook Facebook