কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

দেশি ফলের জাত উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ

বাংলাদেশে দেশীয় ফলের প্রচুর বৈচিত্র্য বিদ্যমান। এদেশে প্রায় ৭০ প্রজাতির ফল জন্মে এবং প্রতিটি প্রজাতিতে আবার প্রচুর ভিন্নতা (variability) রয়েছে। সঠিক ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণের অভাবে কিছু প্রজাতি এরই মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। দেশে বিদ্যমান এসব মূল্যবান জার্মপ্লাজম থেকেই উন্নতমানের জাত উন্নয়ন সম্ভব। ফলের জাত উন্নয়নের জন্য যেসব পদ্ধতি সচরাচর অবলম্বন করা হয় সেগুলো সংক্ষেপে নিম্নে বর্ণনা করা হলো-

 
জার্মপ্লাজম সম্পদ এবং তার ব্যবহার
ফল ফসল হচ্ছে অত্যন্ত অসম গ্রুপের গাছ যাতে রয়েছে বৃক্ষ, গুল্ম, আরোহী এবং বহুবর্ষজীবী লতা। এসব ফল বিভিন্ন জলবায়ু যেমন- উষ্ণ ও অবউষ্ণম-লীয় এবং সুমদ্রপৃষ্ঠ থেকে বিভিন্ন উচ্চতায় জন্মাতে পারে। অন্যদিকে ফল ফসল তাদের উৎস, নামকরণ এবং প্রজনন পদ্ধতি ভেদে বিভিন্ন প্রকার হয়ে থাকে।
 
ফল গাছের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে দীর্ঘ জীবন চক্র। অধিকাংশ ফলই একে অপর থেকে উচ্চ মাত্রায় ভিন্নতর (heterogenous) এবং এ কারণে অযৌন উপায়ে বংশ বিস্তারের মাধ্যমে এদের চাষাবাদ করা হয়। বর্তমান তথ্য অনুসারে জানা যায় যে, প্রাচীন রোমান সাম্রজ্যে এবং গ্রিসে ফলের চাষ তুলনামূলকভাবে অধিক আধুনিক ছিল। অপরদিকে, প্রধান ফলসমূহের চাষাবাদের ইতিহাস অত্যন্ত সমসাময়িক। এরই মধ্যে নতুন কিছু ফলেরও চাষাবাদ আমাদের দেশে শুরু হয়েছে যেমন- ড্রাগন ফল, স্ট্রবেরি ইত্যাদি।
 
প্রকৃতিতে বেশ কিছু বহুবর্ষজীবী ফলের প্রজাতি রয়েছে যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে খাওয়া হয়ে থাকে যেমন- লুকলুকি, বৈচী, কাউয়া, করমচা, কদবেল, আমলকী, অড়বরই ইত্যাদি।
 
এখন পর্যন্ত যে পর্যাপ্ত তথ্য (literature) রয়েছে তা বাণিজ্যিক ফলের উন্নয়নে (improvement) এর অতি প্রাচীন (primitive) জাত এবং অন্য প্রজাতিগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে প্রশ্নাতীতভাবে প্রমাণ করে।
 
চাষযোগ্য ফলগুলোর প্রকৃত উৎস
বিশ্বের উষ্ণম-লীয় অঞ্চল থেকে অধিকাংশ উষ্ণ ও অব-উষ্ণম-লীয় ফলগুলোর উৎপত্তি হয়েছে। লেবু জাতীয় ফলের (Citrus) গণের (genus) বেশ কিছু প্রজাতি (species) যেগুলো, লেবু জাতীয় ফলকে বাণিজ্যিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে, তাদের অধিকাংশেরই আদি উৎপত্তি হচ্ছে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া (Swingle and Reece, ১৯৬৭)
 
দেশি ফলের জার্মপ্লাজম খোঁজ করা ও সংগ্রহ করা
আমাদের প্রধান খাদ্য শস্যের তুলনায় ফল ফসলের কৌলিসম্পদের ভিন্নতা নিরূপণ ও উন্নয়নের জন্য খুবই কম গবেষণা করা হয়েছে। সৃষ্টির পরে মানুষ যখন ফলের ব্যবহার সম্পর্কে কিছু জানতো না তখনও অনেক জার্মপ্লাজম পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়েছে। প্রচুর জার্মপ্লাজম সংগ্রহের পরও অনেক সময় বিজ্ঞানীরা বিশেষ করে প্রজননবিদরা যখন তাদের কাক্ষিত বৈশিষ্ট্য খুঁজে পান না তখন অনেক জার্মপ্লাজম ব্রিডার কর্তৃক হারিয়ে যায়।
 
দেশীয় ফলের শুধু ভালো গুণাবলি দেখে জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করলেই চলবে না, দৈবচয়নের (randomly) মাধ্যমেও কোনো কোনো সময় জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করতে হবে। যেহেতু ফল অত্যন্ত বিষম প্রকৃতির (heterogygous) তাই এতে প্রচ্ছন্ন (recessive) জিন থাকে যা পরবর্তীতে সংকরায়নের ফলে কোন না কোন সময় প্রকাশ পেতে পারে। যেহেতু এ প্রক্রিয়ায় অনেক বেশি সময় লাগে তাই দ্রুত জার্মপ্লাজম সংগ্রহ ও মূল্যায়নের জন্য পক্ষপাতমূলক নির্বাচন (biased) পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।
সুযোগ-সুবিধা বিবেচনায় বীজ বা অযৌন উভয় পদ্ধতিতেই জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করা যেতে পারে। দেশীয় ফলের জার্মপ্লাজম সংগ্রহের জন্য অযৌন উপায়ে বংশবিস্তার সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য, কারণ এতে মাতৃ গুণাগুণ বজায় থাকে।
 
ফলের কৌলিসম্পদ সংরক্ষণ
ঐতিহ্যগতভাবে (Traditionally) সারা বিশ্বে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে যেসব ফল গাছ সংগ্রহ করে থাকে সেগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে। এ সংগ্রহগুলো সচরাচর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় বাণিজ্যিক জাত হিসেবে মুক্তায়নের লক্ষ্যে যথাযথভাবে পরীক্ষা করার জন্য অথবা সংকরায়ন কর্মসূচিতে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করা হয়।
অনেক সময় দেখা যায়, কোনো কোনো জার্মপ্লাজমের এর মূল্য সমসাময়িকভাবে হয়ত ততটা প্রশংসনীয় নয় তাই কোনো কোনো সময় ওই সব জার্মপ্লাজমকে কেটে ফেলা হয়। এ প্রক্রিয়া এখনও চলমান আছে যার অন্যতম কারণ হচ্ছে স্থান ও অর্থায়ন সমস্যা। বর্তমানে ফলের জার্মপ্লাজম সংগ্রহ বলতে প্রধানত যেসব প্রজাতির চাষ হচ্ছে সেগুলোকে সংগ্রহ করা বুঝায়। এক্ষেত্রে প্রচলিত প্রজাতিগুলোর পাশাপাশি অতি প্রাচীন প্রজাতিগুলোও সুষ্ঠুভাবে রক্ষা করা দরকার। এছাড়া আলাদাভাবে প্রতিটি জেনোটাইপ সংরক্ষণের চেয়ে জিন পুল সংরক্ষণ করা উত্তম। দেশীয় ফলের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য আমাদের বর্তমানে যেসব জার্মপ্লাজমের বৈচিত্র্য রয়েছে তা অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে সংরক্ষণ করা দরকার। অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলো যেমন- পোকা ও রোগবালাই প্রতিরোধী, বন্যা, খরা এবং লবণাক্ততা প্রতিরোধী ফলের জাত উন্নয়নে আমাদের দেশে চাষ হচ্ছে এমন ফলগুলো বন্য প্রজাতিগুলো যাতে প্রচুর কৌলিতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য রয়েছে, সেগুলোকে সংরক্ষণ করতে হবে।
 
জার্মপ্লাজম ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ
ফলের জার্মপ্লাজম সংগ্রহ, চাষ ও ব্যবস্থাপনা মানুষকে ১০০০ বছর আগের অনিশ্চিত কৃষি থেকে আজকের সময়ের জন্য উপযুক্ত একটি আধুনিক কৃষি ও সভ্যতায় রূপান্তরিত হতে সমর্থ করেছে। দেশীয় ফলের ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ আমাদের দেশে এখনও ততটা পরিকল্পিত নয়। কিছু কিছু দেশীয় মূল্যবান জার্মপ্লাজম প্রায় বিলুপ্তির পথে, সেগুলোকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করা অত্যন্ত প্রয়োজন। কারণ এসব জার্মপ্লাজমের সঠিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতে উন্নত ফলের জাত মুক্তায়ন করা সম্ভব হবে এবং দেশীয়ভাবেই আমাদের ফলের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বর্তমানে দেবীগঞ্জ, পঞ্চগড় ও বিএআরআই, গাজীপুর এ দুটি ফলের জার্মপ্লাজম রিপোজিটোরি প্রতিষ্ঠা করেছে। এগুলোতে বিভিন্ন প্রকার ফলের গুরুত্বপূর্ণ জার্মপ্লাজম সংরক্ষিত আছে। এ রিপোজিটোরিতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত ফলের জাতগুলো আছে। ফল উন্নয়নের অন্যতম একটি উপায় হলো প্রজনন।
 
প্রজনন (breeding)
পরাগরেণু এবং বীজ ব্যবস্থাপনা
ফলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ (critical) কার্যক্রমগুলো হচ্ছে পরাগরেণু নির্বাচন, প্রস্তুতকরণ এবং পরাগরেণু (pollen) ও বীজের সংরক্ষণ। ফলের প্রজনন কার্যক্রমের সফলতার জন্য বীজের দ্রুত ও সুষম অংকুরোদগম অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
 
পরাগধানী থেকে পরাগরেণু বের হওয়া বিভিন্ন ফলের পরিবারে বিভিন্ন রকম। তাই সঠিক সময়ে এবং সঠিক পদ্ধতিতে পরাগরেণু সংগ্রহ করতে হবে এবং পরবর্তীতে পূর্ব থেকে প্রস্তুত করে রাখা (ফুল ফোটার পূর্বে অর্থাৎ পরাগধানী (anther) ফেটে যাওয়ার (dehiscence) আগেই অপসারণ করতে হবে) স্ত্রী ফুলের গর্ভমুণ্ডে পরাগরেণু স্থাপন করতে হবে এবং ব্যাগ দিয়ে পুষ্পমঞ্জুরিটিকে ঢেকে দিতে হবে। পরবর্তীতে ফল ধারণ হয়ে গেলে ব্যাগটি খুলে দিতে হবে।
 
স্বাভাবিকভাবে, প্রজনন এর জন্য পরাগায়নকৃত মা গাছ থেকে সংগৃহীত সম্পূর্ণ অথবা অতিরিক্ত পাকা ফল থেকে বীজ সংগ্রহ করে যথাযথভাবে আলাদা আলাদা পাত্রে স্থাপন করতে হবে এবং নিবিড়ভাবে যত্ন করতে হবে।
 
সংকরায়ন (hybridization)
ফলের দুটি মাতৃ গাছের মধ্যে সংকরায়নের মাধ্যমে উৎপন্ন স্বাতন্ত্র উদ্ভিদগোষ্ঠীর চারা থেকে ফলের উন্নয়নের তথা ভালো জাত উন্নয়নের জন্য উন্নতমানের ফল গাছ পাওয়া যেতে পারে, যা ভবিষ্যতে ফলের উচ্চফলনশীল, উন্নত গুণগতমানসম্পন্ন, রোগ ও পোকামাকড় প্রতিরোধী এবং প্রতিকূল পরিবেশে (বন্যা, খরা এবং লবণাক্ততা) খাপ খাওয়ানো উপযোগী জাত হিসেবে মুক্তায়ন করা সম্ভব হবে। সংকরায়নের সাফল্য ফলের ফ্লোরাল বায়োলজি, সংশ্লিষ্ট ফল সম্পর্কে সম্যক ধারণা, আবহাওয়াগত কারণ (যেমন- তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, আর্দ্রতা, সূর্যকিরণের তীব্রতা, বাতাস), মৃত্তিকাজনিত কারণ (ভূমির ধরন, মাটির প্রকৃতি ইত্যাদি), রোগবালাই, পোকামাকড় ইত্যাদির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। সংকরায়নের মাধ্যমে ফলের গুণগতমান বা অন্যান্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য পরবর্তী বংশধরে (offspring) স্থানান্তর করা হয়। এক্ষেত্রে যেসব গুণাবলি পরবর্তী প্রজন্মে (offspring) স্থানান্তর করতে হবে সেসব গুণাবলিসম্পন্ন মাতৃগাছ নির্বাচন করতে হবে।
 
মিউটেশন ব্রিডিং
কোন জেনেটিক মেটেরিয়াল এ হঠাৎ এবং বংশানুক্রমিক স্থানান্তরযোগ্য পরিবর্তন ঘটানোর জন্য মিউটেশন হলো অন্যতম মূল ভিত্তি। ফলের প্রজননবিদরা (breeders) প্রধানত জিন ও ক্রোমোসোম মিউটেশন বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। কিন্তু ফল গাছে জিনোম ও সাইটোপ্লাজমিক মিউটেশন ও ঘটে থাকে। কোনো একটি প্লান্ট পপুলেশনে মিউটেশনের মাধ্যমে বৈচিত্র্য-বিভিন্নতা (variation) সৃষ্টি করা হয় যা নির্বাচনের একটি অন্যতম ভিত্তি। কিছু কিছু ফলে প্রচলিত (conventional) প্রজনন প্রক্রিয়া প্রযোজ্য নয়। এছাড়া যেসব ফল গাছ বন্ধ্যা ফল তথা জাইগোটিক ভ্রƒণসহ বীজ উৎপাদন করতে সক্ষম নয় সেসব ফলের জাত উন্নয়নের একমাত্র পদ্ধতি হলো মিউটেশন প্রজনন। লেবুজাতীয় ফলের কিছু জাত এ এপোমিক্সিস প্রধানত দেখা যায়।
 
ফলের প্রচলিত প্রজনন পদ্ধতির বিকল্প হিসেবে মিউটেশন প্রজনন কাজ করতে পারে-
১. প্রকৃতিতে ফলের কোনো প্রজাতির যদি কম বৈচিত্র্য থাকে, ফলে নির্বাচনের মাধ্যমে জাত উন্নয়নের সুযোগ কম থাকে, তখন বৈচিত্র্য সৃষ্টির জন্য;
২. কোনো নতুন বৈশিষ্ট্য যেমন- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, কাক্সিক্ষত বৃদ্ধির ধরন অথবা স্ব-অসামঞ্জস্যতা (self-incompatibility) ঘটানোর (induce) জন্য;
৩. অঙ্গজ বংশবিস্তারের মাধ্যমে উৎপন্ন ও সংরক্ষণ করা;
৪. কোনো অপ্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্যের সাথে স্থাপিত সংযোগ ভেঙে দেয়ার জন্য;
৫. দূরবর্তী সম্পর্কযুক্ত মাতৃগাছ (parent) এর মধ্যে অসামঞ্জস্যতা দূর করার জন্য এবং
৬. হ্যাপলয়েড তৈরি করার জন্য।

অধিকাংশ অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য যেমন- বৃদ্ধি, ফলন, ফলের আগাম পরিপক্বতা ইত্যাদি একাধিক জিন (polygenic) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এক্ষেত্রে নির্বাচন এর দক্ষতা কার্যকারিতা কম কিন্তু মিউটেশনের কার্যকারিতা (efficiency) বেশি। প্রকৃতিগতভাবে ফল গাছে মিউটেশন ঘটে থাকে এবং এর ফলে ফলের বেশ কিছু বাণিজ্যিক জাত বিশেষত লেবুজাতীয় ফলে সৃষ্টি হয়েছে যা পূর্ববর্তী জাতকে সম্পূর্ণভাবে স্থানান্তরিত করেছে। এটি ফলের উন্নয়নে মিউটেশন ব্রিডিংয়ের গুরুত্বকে বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। তাই মিউটেশন পরবর্তীতে ফলের মিউটেন্ট নির্বাচন  ফলের জাত উন্নয়নের একটি শক্তিশালী টুল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
 
নির্বাচন (Selection)
প্রকৃতিতে জন্মানো অতি উত্তম গুণাবলসম্পন্ন চারা চাহিদানুযায়ী বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সংগ্রহ করে জন্মানো সেগুলোকে যথাযথভাবে বৈশিষ্ট্যিকীকরণ এবং মূল্যায়নের মাধ্যমে নির্বাচিত জার্মপ্লাজমকে জাত হিসেবে মুক্তায়নই হচ্ছে নির্বাচন। নির্বাচনের মাধ্যমে জাত উদ্ভাবনের জন্য উত্তম প্রজনন স্টক অপরিহার্য।
 
১. প্রকৃতিতে যেসব অতি উত্তম গুণাবলি সম্পন্ন চারা দেখতে পাওয়া যায় (phenotype) সেগুলো নির্বাচন করা।
২. সবচেয়ে ভালো নির্বাচিত জার্মপ্লাজম-জাতসমূহের অযৌন পদ্ধতিতে বংশ বিস্তার করা।
৩. নির্বাচিত জাতগুলোর আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি যা তাদের ফলন ও অন্যান্য গুণাবলি বৃদ্ধি করবে তার উদ্ভাবন তথা উন্নয়ন করা।
৪. সবচেয়ে ভালো নির্বাচনগুলোর মধ্যে সংকরায়ন করা এবং পুনরায় উত্তম প্রজন্মকে জাত হিসেবে ব্যবহারের জন্য নির্বাচন করা এবং পরে মাতৃ (parent) গাছ হিসেবে ব্যবহার করা এবং এ প্রক্রিয়া পুনঃপুনঃঅনুসরণ করা।
 
ফলের প্রজনন স্টকের (বিভিন্ন ক্রস থেকে পাওয়া পরিবারগুলো) পরিমাণগত জেনেটিক্স থেকে জানা যায় যে, ফলের উন্নয়নের জন্য এতে প্রচুর জেনেটিক পটেনশিয়াল রয়েছে এবং এক্ষেত্রে নির্বাচন হচ্ছে ফলের জাত উন্নয়নের জন্য একটি সবচেয়ে দক্ষ পদ্ধতি। অনেক প্রাচীন দেশীয় ফলের জাত রোগ ও পোকামাকড় প্রতিরোধী জিন বহন করে। সেসব জিনকে প্রচলিত প্রজনন প্রক্রিয়ায় সংবেদনশীল জাতে স্থানান্তর করে ফলের রোগ পোকামাকড় প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবন করা যেতে পারে।
 
বালাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট অদ্যাবধি বিভিন্ন দেশীয় ফল যেমন- আম-১০টি, কাঁঠাল-৪টি, কলা-৪টি, পেঁপে-১টি, লিচু-৫টি, লেবু-৩টি, বাতাবিলেবু-৪টি, মাল্টা-১টি, কমলালেবু-২টি, সাতকরা-১টি, কুল-৪টি, সফেদা-৩টি, নারিকেল-২টি, পেঁপে-১টি, আমড়া-১টি, কদবেল-১টি, কামরাঙা-১টি, লটকন-১টি, জামরুল-২টি, আঁশফল-২টি, আমলকী-১টি, বিলাতিগাব-১টি, তৈকর-১টি এবং জলপাই-১টি সর্বমোট ৫৭টি ফলের জাত উদ্ভাবন করেছে। সংকরায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উদ্ভাবিত বারি আম-৪সহ অধিকাংশ জাত বর্তমানে সারাদেশে সমাদৃত হয়েছে।
 
সম্প্রসারণ
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, বিএডিসি, এনজিও, প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি নার্সারিগুলোর মাধ্যমে উন্নত জাতের গুণগতমানসম্পন্ন কলম-চারা উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকের জন্য সহজলভ্য করতে হবে।
 
ফলের চাষ সম্প্রসারণ তথা ফলের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ফলের আধুনিক চাষাবাদ সম্পর্কিত প্রযুক্তি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হবে।
 
গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ও বিএডিসির মধ্যে সমন্বয় এবং সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হতে হবে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এখন পর্যন্ত মোট ৩১টি বিভিন্ন ফলের যে ৭০টি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে, সেগুলোর মাতৃবাগান ডিএই এবং বিএডিসির হর্টিকালচার সেন্টারগুলো স্থাপন এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা করতে হবে। সেখান থেকে প্রতি বছর পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদিত ফলের উন্নত জাতের মান সম্পন্ন কলমের চারা বিক্রয় করবে।  
 
মাঠ পর্যায়ে কর্মরত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের আধুনিক পদ্ধতিতে ফল চাষ বিষয়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে যা দেশে ফল চাষ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
 
সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নার্সারিম্যান ও কৃষকদের সঠিক ও গুণগতমানসম্পন্ন কলম-চারা উৎপাদন বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
 
বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রচুর নার্সারি রয়েছে, যেখানে অধিকাংশেরই ফলের উন্নত জাতের মাতৃবাগানের অভাব রয়েছে। ফলে প্রায়শই কৃষকরা সঠিক জাতের কলম-চারা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হন। ব্যক্তিমালিকানাধীন নার্সারিতে ফলের উন্নত জাতের মাতৃগাছের বাগান তৈরিতে তাদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে যাতে করে কৃষকরা উন্নত জাতের মানসম্পন্ন কলম-চারা পেতে পারেন।
 
বীজ থেকে উৎপাদিত ফল গাছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাতৃগুণাগুণ বজায় থাকে না, তাছাড়া বীজের গাছ থেকে ফল পেতে প্রাথমিক সময়ও অনেক বেশি লাগে। ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি ও উন্নত গুণগতমানসম্পন্ন ফল পেতে হলে অঙ্গজ বংশবিস্তার পদ্ধতিতে উৎপাদিত চারা বেশি করে রোপণ করতে হবে। এতে করে সারাদেশে উন্নত গুণগতমানসম্পন্ন ফলের চাষ দ্রুত সম্প্রসারিত হবে। কৃষকরা যেন কলমের চারা রোপণ করেন সে বিষয়ে তাদের সচেতন করতে হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মাঠকর্মীদের মাধ্যমে এ কাজটি দ্রুততম সময়ে সুচারুরূপে সম্পন্ন করা যেতে পারে।
 
বাংলাদেশে পাহাড়ি এলাকায় প্রচুর পতিত জমি রয়েছে যেখানে অনায়াসেই উন্নত জাতের ফল আবাদের মাধ্যমে এর সম্প্রসারণ করা সম্ভব। একক জমিতে দানাজাতীয় ফসলের চেয়ে ফলের ফলন বেশি এবং ফল চাষ অধিক লাভজনক হওয়ায় বাংলাদেশের অনেক এলাকায় কৃষকরা তাদের দানাজাতীয় ফসলের জমিতে নতুন নতুন ফলের বাগান গড়ে তুলছেন, যা বাংলাদেশে ফলের আবাদকে সম্প্রসারিত করছে। বর্তমানে বাংলাদেশে মোট চাষযোগ্য জমির মাত্র ১.৬৬ শতাংশ জমিতে ফল চাষ করা হয়ে থাকে। সম্প্রসারণ কার্যক্রম দ্বারা ফল চাষের আওতাধীন এ জমির পরিমাণ বৃদ্ধি করা সম্ভব। এছাড়াও, বসতবাড়ি, পুকুরপাড়, রাস্তার ধার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চত্বর, অফিস এলাকা ইত্যাদি জায়গায় পতিত জমিতে  অনায়াসে ফল চাষ করা সম্ভব।
 
শহরাঞ্চলের বসতবাড়ি ও ছাদে ফল চাষ দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। বনায়নের ক্ষেত্রে, শুধু কাঠ উৎপাদনশীল গাছের পরিবর্তে ফল ও কাঠ দুটোই পাওয়া যায় এমন ফল গাছ  বেশি করে রোপণ করতে হবে। ফল বাগানের জন্য জমির প্রাপ্যতা কষ্টসাধ্য হওয়ায় একই জমিতে একক ফল চাষের আওতাধীন পরিবর্তে বিভিন্ন ফল ও ফসলের সমন্বিত চাষের মাধ্যমে বছরব্যাপী ফল সংগ্রহ করা সম্ভব। বহুস্তরবিশিষ্ট অর্থাৎ বিভিন্ন উচ্চতার যেমন-নারিকেল বাগানে লেবু, লটকন, লিচু, আনারস ইত্যাদি ফলের মিশ্র বাগানে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধির পাশাপাশি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারও নিশ্চিত করা সম্ভব।  এছাড়া বিভিন্ন সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে ফল চাষ সম্প্রসারণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা বিশেষ প্রয়োজন।
 
বছরের মাত্র ৪ মাস সময়ে (মে-আগস্ট) দেশে মোট ফলের ৬১ ভাগ উৎপাদিত হয় কিন্তু অবশিষ্ট ৮ মাস সময়ে  (সেপ্টেম্বর-এপ্রিল) ফলের প্রাপ্যতা খুবই কম থাকে। তাই সেপ্টেম্বর থেকে এপ্রিল এ সময়ে জন্মে এমন সব দেশীয় ফলের আবাদে কৃষকদের বেশি করে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এতে করে ফলের উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি বছরব্যাপী ফলের প্রাপ্যতা নিশ্চিত হবে। বেশিরভাগ দেশীয় অপ্রচলিত ফল বছরের এমন সময় উৎপাদিত হয় যখন অন্যান্য প্রধান ফলের প্রাপ্যতা খুবই কম থাকে বা থাকে না। তাই অপ্রচলিত ফল সারা বছর পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ফল চাষ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। অপরদিকে অমৌসুমে জন্মানোর কারণে অপ্রচলিত ফলের বাজার মূল্য বেশি পাওয়া যাবে।
 
ফলের সংগ্রহোত্তর অপচয় (২৫ থেকে ৪০ শতাংশ) রোধ ও সঠিক গুণগতমান বজায় রাখার জন্য লাগসই উন্নতমানের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করার মাধ্যমে ফল যথাযথভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এর মাধ্যমে শস্য সংগ্রহোত্তর ক্ষতি (Postharvest loss) অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে ও ফলের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষকগণ বেশি করে ফল চাষে আগ্রহী হবে।
 
দেশে ১ কোটি ৯৪ লাখ বসতবাড়ির আওতাধীন জমির পরিমাণ ৪.৫ লাখ হেক্টর। বেশি করে ফল বৃক্ষের বাগান তৈরিতে কৃষকদেরকে উৎসাহিত করতে হবে। বসতবাড়ির পাশাপাশি-বাড়ির আঙিনায় পরিকল্পিতভাবে উন্নত জাতের বিভিন্ন ফল গাছ লাগাতে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। অধিকন্তু ফলের পুষ্টিগুণ ও অর্থনৈতিক লাভ সম্পর্কে কৃষকদের সচেতন করতে হবে। আমাদের দেশে উৎপাদিত মোট ফলের প্রায় ৫৩ শতাংশ বসতবাড়ি থেকে আসে। পরিকল্পিতভাবে একটি বাড়ি, একটি খামার ব্যবস্থাপনায় ফলদ বৃক্ষ রোপণ করা হলে ফল চাষ সম্প্রসারণের পাশাপশি পুষ্টি সমস্যার সমাধান, বাড়তি আয় এবং মহিলাদের কর্মসংস্থানর সৃষ্টি হবে ।  
 
পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সিলেট, চট্টগ্রাম, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত এলাকায় অনেক পতিত জমি পড়ে আছে যেখানে উপযুক্ত কার্যকর পরিকল্পনার দ্বারা ফল বাগান স্থাপন করে পতিত জমি চাষের আওতায় আনার মাধ্যমে ফল চাষ সম্প্রসারণ এবং ফলের উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব।
 
 বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ইত্যাদি প্রতিকুল পরিবেশে টিকে থাকতে পারে এমন সব ফসলের সঠিক জাত (যেমন- লবণাক্ত ও খরাযুক্ত এলাকায় কুলের চাষ) নির্বাচন ও রোপণ করতে হবে। এর ফলে ফলের সার্বিক উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে ও ফলের চাষ সম্প্রসারিত হবে। অধিকন্তু, ফলের চাষ সম্প্রসারণের জন্য ফলের উদ্ভাবিত উন্নতজাতগুলো ও এদের উৎপাদন কলাকৌশল মাঠ পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য কৃষকদের মাঠে প্রদর্শনী বাগান স্থাপন, গবেষণা কেন্দ্রে মাঠ দিবসের আয়োজন এবং ফল উৎপাদনের আধুনিক কলাকৌশল সম্পর্কিত লিফলেট-ফোল্ডার-বুকলেট ফল চাষিদের মাঝে বিতরণের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
 
পরিশেষে বলা যায়, দেশি ফলের উন্নত জাত উদ্ভাবন ও এসব উন্নত গুণগতমানসম্পন্ন জাতের চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে মানুষের পুষ্টিচাহিদা মিটানোর পাশাপাশি, বাড়তি আয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ সম্ভব হবে।
 
ড. মদন গোপাল সাহা*

ড. বাবুল চন্দ্র সরকার**

*মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, **প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ফল বিভাগ, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বারি, গাজীপুর

Share with :

Facebook Facebook