কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

আম উৎপাদন সংগ্রহ সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ

আম বাংলাদেশের প্রধান ফল, গ্রীষ্ম প্রধান দেশে ফলের মধ্যে আম সবার সেরা, ফলের রাজা। নানা আকারের বাহারি আম অতি সুস্বাদু ও পুষ্টিতে ভরপুর। আমে রয়েছে সব ধরনের পুষ্টি উপাদান বিশেষ করে এতে ভিটামিনস ও মিনারেলসের পরিমাণ অনেক বেশি। এককালে বৃহত্তর রাজশাহী, যশোর, কুষ্টিয়া, দিনাজপুর ও রংপুর জেলা উন্নতমানের আমের জন্য বিখ্যাত ছিল। এসব এলাকা প্রধানত ল্যাংড়া, গোপালভোগ, ফজলি, হিমসাগর, মোহনভোগ, গোলাপ খাস, সূর্যপুরি, মিসরি ভোগ, আশ্বিনাসহ প্রায় কয়েক শ’ জাতের আম উৎপাদনে অগ্রগামী ছিল। দেশের অন্য প্রান্তের জনসাধারণ মধুর মাস জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়-শ্রাবণে রাজশাহী অঞ্চলের সেরা আমের জন্য অপেক্ষা করত। পরে আম সম্প্রসারণে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এক ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করে। এ কর্মসূচিতে আম্রপলি জাতের আমটিকে দেশের সব প্রান্তে সম্প্রসারণে প্রাধান্য দেয়া হয়। ফলে দেশের শুধু উত্তরাঞ্চলে নয়, বর্তমানে বৃহত্তর সিলেট, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগাম এবং বরিশাল অঞ্চলের জেলাগুলোতেও এ জাতের আম প্রচুর উৎপাদন হচ্ছে। এ বিশেষ কর্মকাণ্ডের ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে বর্তমানে মোট যে আম উৎপাদন হচ্ছে তার প্রায় শতকরা ৪০-৪৫ ভাগই আম্রপলি জাতের আম।

 
কয়েক বছর ধরে আম্রপলি জাতের আমের পাশাপাশি যেসব জাতের আম চাষে অনেকেই আগ্রহী হচ্ছে তার মধ্যে রংপুরের হাঁড়িভাঙ্গা, ঠাকুরগাঁওয়ের বান্দিগুড়ি, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গৌরমতি, বারি উদ্ভাবিত বারি-৪, বাউ উদ্ভাবিত বাউ-১৪ (ব্যানানা ম্যাংগো),  ‘রাংগুয়াই’ (বার্মা), পলিমার (ভারত), নান ডকমাই (থাই) অন্যতম।
 
আম ফলের অবদান : আম ফল চাষে অগ্রগামী জেলাগুলোতে বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জে মৌসুমে ৩-৪ মাসব্যাপী আম সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণসহ সংশ্লিষ্ট কাজে সব শ্রেণী ও বয়সের ছেলেমেয়ে, পুরুষ, মহিলা প্রচুর কাজের সুযোগ পায়, আয় বাড়ে, পারিবারিক সচ্ছলতা আসে। স্থানীয় পরিবহন (রিকশা, বাইসাইকেল, অটোরিকশা, নসিমন, করিমন, মিনিট্রাক-পিকআপ) খাতে আয়  বৃদ্ধিসহ সংশ্লিষ্ট সবার যথেষ্ট আয় বাড়ে। এ ছাড়া আন্তঃজেলা পরিবহনে (বাস, ট্রাক, ট্রেন, ট্রলার, কুরিয়ার সার্ভিস) সঙ্গে জড়িত সবার প্রচুর আয় বৃদ্ধি পায় ।
 
আম উৎপাদনকারী এসব এলাকা ঝড় বাতাসে ঝরে পড়া কাঁচা-পাকা আম খাওয়ার প্রচুর সুযোগ পায়। এ সময় বেশি আম খাওয়ার প্রভাবে  সবার স্বাস্থ্য ভালো হয়, দৈনন্দিন ভাত আহার করার প্রবণতা অনেক কমে যায়। মৌমাছির আনাগোনা বেড়ে যায়, এ সময় তাদের বেশি মধু আহরণ সুযোগ সৃষ্টি হয়। আম মৌসুমে এলাকায় হরেক রকম পাখির (বাদুড়, কাক, কোকিল, ঘুঘু ইত্যাদি) আনাগোনা বেড়ে যায়। এ সময় তাদের খাদ্য, আশ্রয় ও বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এছাড়াও বন্য ও গৃহপালিত পশুদের কাঁচা-পাকা আম ও পরিত্যক্ত অংশ (ছিলকা, আঁটি) খাবার সুযোগ বাড়ে, ফলে সবাই সুস্বাস্থ্য ফিরে পায়।
 
কাঁচা-পাকা আম থেকে আমচুর, আমসত্ত্বসহ নানা রকম আচার তৈরির কাজে এলাকায় হিড়িক পড়ে যায়। রান্নায় প্রাধান্য পায় আম-বেগুন-বড়ির তৈরি তরকারি, ডালে আম, সজিনায় আম এ এক মধুর ব্যাঞ্জন। স্থানীয়ভাবে তৈরি আমের জ্যাম, জেলি এলাকাবাসী নিজেরা খায়, অন্য জেলার আত্মীয়স্বজনকে সরবরাহ করে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান (প্রাণ, এসিআই, স্কয়ার) কাঁচা-পাকা আম সংগ্রহ করে। এগুলো তারা প্রক্রিয়াজাত করে উৎপাদিত হরেক রকম প্রডাক্টস সারা বছরব্যাপী দেশে-বিদেশে বাজারজাত করে প্রচুর আয় করে।
 
আম বাজারজাতকরণ পরিস্থিতি ও প্রভাব : এককালে আম চাষে অগ্রগামী বৃহত্তর রাজশাহীর আমচাষিরা বড় বড় বজরা-নৌকা দিয়ে ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোতে আম বাজারজাত করত। পরে সহজ এ রুট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ট্রাক, বাস, ট্রেন, কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে  আম বাজারজাতকরণের বিকল্প পরিবহন ব্যবহার হয়ে আসছে। আমচাষিদের মধ্যে ১০ থেকে ১৫ বছর আগে কোনো রকম কেমিক্যাল ব্যবহার ছাড়া ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায়  পরিপক্ব কাঁচা আম বাজারজাত করার প্রচলন ছিল। পাকা আমের সেলফ লাইফ কম হওয়ায় ব্যবসায়ীদের পক্ষে তা দূর-দূরান্তে বেচার সুযোগ থাকে না। কাজেই স্থানীয়ভাবে খুব কম দামে স্থানীয় এলাকাবাসী পাকা আম কেনার সুযোগ পান। বিগত ৫ থেকে ৭ বছর ধরে আম ব্যবসায়ীদের মাঝে ঢাকাসহ অন্য জেলাগুলোতে আম বাজারজাত করতে আধুনিকায়নের ছোঁয়া লেগেছে। আমকে সমভাবে পাকাতে ও আকর্ষণীয় রঙ হতে ও কিছুটা আয়ু (সেলফ লাইফ) বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে কিছু আম ব্যবসায়ীর আমে কয়েক ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এগুলোর মধ্যে ইথোফেন, ফরমালিন ও কার্বাইড অন্যতম। আম ফলে এসব রাসায়নিকের প্রভাব সম্বন্ধে কোনো প্রকার জ্ঞান বা ধারণা আহরণ না করেই অনেক পরিবেশবাদী, বুদ্ধিজীবী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিভিন্ন মিডিয়া কেমিক্যাল ব্যবহারের কুফল সম্বন্ধে অপপ্রচারে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এ প্রচারণার কুফলে আম ফলের প্রতি অনুরাগী ভোক্তার মনে ভয় ঢুকেছে, বাজারের আম কিনতে তারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের টিকে থাকাই বর্তমানে কঠিন হয়ে পড়েছে। বৃহত্তর রাজশাহীসহ অন্য অধিক আম উৎপাদনকারী জেলাগুলোতে মুকুল আসার শুরুতে এমনকি তার অনেক আগেই ২ থেকে ৫ বছরের জন্য আম বাগান কিনে নিতে প্রয়াসী ছিল। এ ব্যবস্থায় আমচাষিদের বাগান অনেক আগেই কিনে নিতো। বেশি লাভের আশায় তারা কেনা বাগানের সঠিক পরিচর্যা ও রোগ পোকামাকড় দমন করে বেশি আম উৎপাদন পদক্ষেপ নিতো। তাতে বাগানের মালিক ও ক্রেতা উভয়েই বেশি  লাভবান হতো। কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তৎপরতায় এসব আম ব্যবসায়ী বাগান কেনায় নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েছে। আমচাষিরা এ খাতে অধিক আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। নতুন আম বাগান সৃষ্টি হুমকির মুখে পড়েছে। এমনকি পুরনো বাগানগুলো রাখা যাবে কিনা এ চিন্তায় বাগানীর মাথায় হাত।
 
প্রশিক্ষণ : বিভিন্ন মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী, পরিবেশবাদীদের অপপ্রচারে অনুপ্রাণিত হয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আম ফল নিধনে অতি উৎসাহী হয়ে উঠেছে। কয়েক বছর ধরে তাদের তৎপরতায় কত হাজার টন যে আম নিধন হয়েছে তার প্রকৃতি তথ্য দেয়া কঠিন। অথচ যারা এ দায়িত্বে আছেন তাদের ব্যবহৃত রাসায়নিক দ্রব্য সম্বন্ধে কোনো প্রশিক্ষণ বা ধারণা দেয়া হয়েছে বলে মনে হয় না। আমে ব্যবহৃত কেমিক্যাল ব্যবহারে পূর্ণ ধারণার অভাবের কারণে আমচাষি ও আম ব্যবসায়ীর বর্তমানে বেহাল অবস্থা। বিরাজিত পরিস্থিতি থেকে আম সম্পদ ও আমচাষিদের বাঁচাতে এ ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রশিক্ষণ দানের ব্যবস্থা নেয়া অত্যাবশ্যক।
 
রাসায়নিক পরীক্ষা যন্ত্র : ক্ষেত্র বিশেষে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা রাসায়নিক দ্রব্যের উপস্থিতি নিরূপণে যে যন্ত্র ব্যবহার করছে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও গবেষকদের কাছে প্রতীয়মাণ হয়েছে যে তা ডিফেক্টিভ, তা থেকে প্রকৃত ফল পাওয়া যায় না। তাই এ যন্ত্রের ওপর নির্ভর করে আমচাষি-ব্যবসায়ীদের আম নিধন করার এখতিয়ার বিষয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সর্বোপরি এসব রাসায়নিক (ফরমালিন, ইথোফেন, কার্বাইড) মানবদেহের জন্য গ্রহণযোগ্য বা সহনীয় মাত্রা সম্বন্ধে গবেষক কর্তৃক তাদের ধারণা দেয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
 
আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দলে বিশেষজ্ঞের অন্তর্ভুক্তিকরণ : সীমিত ধারণা নিয়ে আমচাষি-ব্যবসায়ীদের ওপর ঢালাওভাবে আম নিধন, জরিমানা, জুলুম ও হয়রানি নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতি টিমে একজন এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ-বিজ্ঞানী-অভিজ্ঞ সম্প্রসারণ কর্মকর্তাকে সম্পৃক্ত করা অত্যাবশ্যক। অন্যথায় অসহায় আমচাষি আর্থিক ক্ষতি ও বিব্রতকর বিভিন্ন পরিস্থিতি থেকে অব্যাহতি পেতে হয়তো তারা তাদের প্রিয় আম বাগানটিকে নিধন করতে বাধ্য হবে। এর প্রভাবে প্রাণিকূলের চাহিদাকৃত অক্সিজেন সঙ্কট দেখা দেবে, দেশে পরিবেশ বিপর্যয় হওয়ার আশঙ্কা হবে, বাজারে আমের সরবরাহ কমে যাবে, আম ফল অনুরাগীদের তা ক্রয়ে সুযোগ ব্যাহত হবে।
 
আমে ব্যবহৃত সম্ভাব্য রাসায়নিক দ্রব্য
১। ইথোফেন-ইথরেল (২ ক্লোরোইথেন ফসফরিক এসিড) : ইথোফেন একটি প্লান্ট গ্রোথ হরমোন, তবে ইহা পরিপক্ব ফলকে পাকাতে এবং সংরক্ষণে ব্যবহার প্রচলন সারা পৃথিবীতে রয়েছে। গবেষকেরা বিভিন্ন মাত্রায় (২৫০-১০০০০ পিপিএম) ইথোফেন পরিপক্ব কাঁচা আমে স্প্রে করার ২৪ ঘণ্টা পর পুনরায় তার উপস্থিতি মাত্রা নির্ণয় করতে গিয়ে দেখতে পান যে উহা দ্রুত ফলের উপরিভাগ থেকে উড়ে যায়। তবে যেটুকু অবশিষ্ট থাকে তা ঋঅঙ/ডঐঙ কর্তৃক নির্ধারিত গ্রহণযোগ্যতা মাত্রার (এমআরএল-২পিপিএম) অনেক নিচে নেমে যায়। তাই ইথোফেন দিয়ে ফল পাকানোর স্বাস্থ্যগত কোনো ঝুঁকি নেই বলে বিজ্ঞানীদের মতামত। তবে আম চাষিরা যেন অতিরিক্ত মাত্রায় ইথোফেন ব্যবহার না করে এবং উহা কেবলমাত্র পুষ্ট কাঁচা আমে ব্যবহার করে সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দান ও বহুল প্রচার ব্যবস্থা নেয়া অত্যাবশ্যক।
 
২। ফরমালিন : আমের স্বাস্থ্য, উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি ও আয়ু (সেলফ-লাইফ) বৃদ্ধির জন্য কোনো কোনো আম ব্যবসায়ী কাঁচা আমে ফরমালিন ব্যবহার করে থাকে। তবে ব্যবহারের ৫-৭ দিন পর এ ধরনের ফরমালিনের তেমন কোনো প্রভাব থাকে না বলে গবেষকদের অভিমত। অধিকন্তু আমের বাইরের চামড়া বা ছিলকা পুরু হওয়ার কারণে আমের আহার্য অংশে তা প্রবেশ সম্ভবনা খুবই কম। ফরমালিনের উপস্থিতি নির্ণয়ে বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে যে ফরমালডিহাইড টেস্ট মিটার (জেড-৩০০) ব্যবহার করা হচ্ছে তার কার্যকারিতা নিরূপণে গবেষকরা ব্যবস্থা নেন। ইথোফেন মিশ্রিত পানিতে এবং ফরমালিন মিশ্রিত পানিতে আম চুবানোর একদিন পর এ টেস্ট মিটার দিয়ে তারা পরীক্ষায় একই ফল দেখতে পান। কাজেই ফরমালডিহাইড মিটার (জেড-৩০০) দিয়ে ফরমালিন মাপা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলে তাদের অভিমত। প্রকৃত পক্ষে ফরমালিন হলো ৩৭% ফরমালডিহাইড। মানবদেহে প্রতি মিলিলিটার রক্তে প্রকৃতিগতভাবে সর্বোচ্চ ২.৫ মাইক্রোগ্রাম ফরমালিনের উপস্থিতি পাওয়া যায়। মানবদেহে মেটাবিলিজম প্রক্রিয়ায় ফরমালডিহাইড প্রয়োজন। হজম প্রক্রিয়ায় উহা ফরমিক এসিডে রূপান্তরিত হয় এবং তা প্রস্রাবের সাথে এবং সামান্য অবশিষ্ট অংশ নিশ্বাসের সাথে কার্বনডাইঅক্সাইড আকারে বের হয়ে যায়। এমনকি তা দেহের চর্বিতে ও জমা থাকে না। ফরমালিন পানিতে দ্রুত গলে বা মিশে যায় এবং কর্পুরের মতো বাতাসে উড়ে যায়। গবেষকেরা বিভিন্ন ফলবাজার ঘুরে সংগৃহীত নমুনায় কোনো ফরমালিনের উপস্থিতি পাননি। তথাপি সন্দেহ হলে আহারের আগে ফলকে পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে নিয়ে একদিন পরে তা আহার করলে নিরাপদ বলে বিবেচিত। তাই আমে ফরমালিনের বিরূপ প্রভাব নিয়ে যে নানামুনি নানা প্রচারণা ছড়াচ্ছে তা ভিত্তিহীন বলে প্রতীয়মাণ হয়।
 
৩। ক্যালসিয়াম কার্বাইড : পরিপক্ব ও অপরিপক্ব উভয় ধরনের আমে কার্বাইড ব্যবহার করলে তাতে ফলের উপরিভাগে পাকা আমের মত রঙ আসে। অপরিপক্ব টমেটোতে ইহা প্রয়োগ করে আগাম পাকানোর প্রচলন দেখা যায়। তবে অপরিপক্ব আমে কার্বাইডের ব্যবহার তেমন একটা লক্ষ করা যায় না। কোনো কোনো অসাধু আম ব্যবসায়ী পরিপক্ব কাঁচা আম ঝুড়িতে রাখার আগে ৫ থেকে ৭ গ্রাম ক্যালসিয়াম কার্বাইড কাপড়ের পুঁটলিতে বেঁধে ঝুড়ির তলায় রেখে আম দিয়ে ঝুড়ি ভর্তি করে। এতে ঝুড়ির ভেতর গ্যাস তৈরি হয়। ভেতর গরম হয় এবং আমের গায়ে ঘাম ঝরে। এ আমের ঝুড়ি নির্দিষ্ট বাজারে পৌঁছলে তা খুলে দিলে গ্যাস আকারে (কার্বন মনোঅক্সাইড) উড়ে যায়। মার্চ এপ্রিল মাসে দেশের আগাম জাতগুলো (গোপালভোগ, হিমসাগর, খুদিখিরসা, গোলাপ খাস) অপরিপক্ব থেকে যায়। তবে মে মাসের প্রথম ভাগে সাতক্ষীরা বেল্টের আম থেকে রাজশাহী অঞ্চলে আগাম জাতের আম পরিপক্ব হতে প্রায় ৩ সপ্তাহ বেশী সময় লাগে। তাই আগাম জোনের (সাতক্ষীরা, যশোহর, কুষ্টিয়া) এ ধরনের আগাম জাতের আম মে মাস থেকে এবং রাজশাহী জোনের আম মে মাসের শেষ ভাগে কাঁচা আম পরিপক্ব হয়। মার্চ-এপ্রিল মাসে এসব আগাম জাতের স্থানীয় আম বাজারে পাওয়া গেলে ধরে নিতে হবে তা কার্বাইড দিয়ে পাকানো। কাজেই এ সময়ে বাজারে প্রাপ্ত আম খাওয়া কোনো মতেই ঠিক হবে না। ফল পাকাতে কোনোক্রমেই যেন ক্যালসিয়াম কার্বাইড বা কার্বাইড ব্যবহার না করে সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতা আনায়ন দরকার। কেননা ক্যালসিয়াম কার্বাইড মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক।
 
আম শোধনে রাসায়নিক ব্যবহার : গাছ থেকে আম পাড়ার পর আমের কস বা দুধ বের হয়ে গেলে আম শোধন উপযোগী হবে। প্রতি লিটার পানিতে ০.৫৫ মি.লি. ‘প্লোক্লোরাজ’ নামক রাসায়নিক দ্রব্য মিশানো পানিতে আম ভালোভাবে ধুয়ে শুকিয়ে নিতে হবে। এভাবে আম শোধনে আমের পচন রোধ হয় ও উজ্জ্বলতা বজায় থাকে। অধিকন্তু, আম পাড়া থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত আমের জীবনী (সেলফ লাইফ) ২-৩ সপ্তাহ বজায় থাকে। আম রপ্তানিকারক সব দেশেই এ পদ্ধতির ব্যবহার প্রচলন আছে। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে প্রতি লিটার পানিতে ০.৫-১.০০ গ্রাম ‘বেনোমিল’ নামক রাসায়নিক দ্রব্য মিশিয়ে তাতে একইভাবে আম শোধন করা যাবে। এ পদ্ধতিতে আম শোধন ব্যবস্থা ভারতে অতি জনপ্রিয়। অধুনা, কিছু সচেতন আমচাষি ভারত থেকে ‘বেনোমিল’ এনে আম শোধন করে সুফল পেয়ে আসছে।

গরম পানিতে আম শোধন : গরম পানিতে পরিপক্ব কাঁচা আম শোধন করা হলে, আমের গায়ে লেগে থাকা রোগ জীবাণু ও পোকা মুক্ত হবে। গ্রাহকের কাছে অন্য আমের তুলনায় এ শোধিত আমের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে। মৌসুমে পরিপক্ব পুষ্ট কাঁচা আম গাছ থেকে সাবধানে পেড়ে তা আগে পরিষ্কার পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। এরপর কোন পাত্রে ৫২০- ৫৫০ সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পানি (পানিতে হাত ডুবালে সহনীয়মাত্রায়) গরম হলে তাতে পরিষ্কার করা আমগুলো ঠিক ৫ মিনিট রেখে এক সাথে উঠিয়ে নিতে হবে। আমের গা থেকে পানি শুকিয়ে গেলে স্বাভাবিক নিয়মে আমগুলো প্যাকিং করে বাজারজাত করতে হবে। এ ব্যবস্থায় আমের জাতের প্রকারভেদে সাধারণ আমের (নন ট্রিটেট) চেয়ে গরম পানিতে শোধন করা আমের আয়ু (সেলফ লাইফ) ১০ থেকে ১৫ দিন বেড়ে যাবে। তবে এ পদ্ধতি প্রয়োগ সীমিত পরিমাণ আমের জন্য প্রযোজ্য।
 
এম এনামুল হক*
সামিনা হক**
* প্রাক্তন ডিজি, ডিএই; ** সহকারী অধ্যাপক, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ধানমন্ডি, ঢাকা

Share with :

Facebook Facebook