কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

কৃষি যান্ত্রিকীকরণে বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা

কৃষি ব্যবস্থা একটি বহুমুখী কর্মধারার সমন্বয়। বাংলাদেশের জিডিপি প্রায় এক-চতুর্থাংশই বর্তমানে কৃষি সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। কৃষি সেক্টরের মধ্যে শুধুমাত্র শস্য ক্ষেত্রে এর অবদান কৃষি জিডিপির প্রায় ৬০ শতাংশ। কৃষি প্রযুক্তি কৃষি সেক্টরের উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বীজ, সার ও কীটনাশক, পানি ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি যন্ত্রপাতিই মূলত দেশে ব্যবহৃত কৃষি প্রযুক্তি। এর মধ্যে কৃষি যন্ত্রপাতি তথা কৃষি যান্ত্রিকীকরণ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি। বাংলাদেশে প্রায় ৬২ শতাংশ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা রয়েছে কৃষি সম্পর্কিত বিভিন্ন সেক্টরে, যার মধ্যে শস্য সেক্টরেই প্রায় ৫৫ শতাংশ। দেশের জনসংখ্যার ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে কৃষি সেক্টরের যেমন চাপ বাড়ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে খাদ্য শস্য উৎপাদন, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এই সেক্টরের গুরুত্ব। নানা সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ফলে দেশের শস্য উৎপাদন বিগত ২৫ বছরে প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি অর্জন সম্ভব হয়েছে। গত অর্থবছরে খাদ্য শস্য উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৬৯৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন। তবে শস্য সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তির ক্ষেত্রে শুধুমাত্র কৃষি যন্ত্রপাতির সঠিক ব্যবস্থাপানার অভাবে প্রতি বছর মোট খাদ্য শস্য উৎপাদনের ৭-১০ ভাগ অপচয় হয়। কৃষি কাজের প্রতিটি স্তরে স্তরে কৃষি যন্ত্র ব্যবহার নিশ্চিতকরণ করা হলে বছরে আরো ৭০ মিলিয়ন খাদ্যশস্য উৎপাদন বেশি হতো। কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন ব্যাপক কৃষি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দানা শস্যের উৎপাদন বৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন যে, উন্নত কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রযুক্তি প্রয়োগে শস্য উৎপাদনের কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রাপ্ত সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও ফসল কর্তনোত্তর ক্ষতি কমানোর মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।


বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ হলেও কৃষি সেক্টরে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার পর দেশে কৃষি প্রযুক্তি যান্ত্রিকীকরণে স্বর্ণযুগের আরম্ভ হয়। ঐ বছর বিদেশ থেকে আমদানিকৃত কৃষি যন্ত্রপাতির ওপর থেকে ‘কৃষি যন্ত্রপাতির মান নিয়ন্ত্রণ কমিটি’ এর শর্তগুলো শিথিল করলে দেশে পাওয়ার টিলার আমদানি বেড়ে যায়। আর এভাবে কৃষি কাজে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের স্বর্ণ যুগ শুরু হতে থাকে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণে চাষের পর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় বীজ বপন, গুটি ইউরিয়া সার প্রয়োগ, শস্য কর্তন, শস্য মাড়াই, শস্য ঝাড়াই সহ অন্যান্য কার্যাবলিতে কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার। একটা ফসল কাটার পর আর একটা ফসল লাগানোর মধ্যবর্তী সময় না কমালে কৃষিযন্ত্র ব্যবহার করে ফসলের নিবিড়তা বাড়ানো সম্ভব নয়। যান্ত্রিকীকরণের বহুবিধ সুবিধাদির ফলে কৃষক দিন দিন কৃষিযন্ত্রের প্রতি ঝুঁকে পড়ছে। কৃষিযন্ত্র ব্যবহারে কৃষকদের ফসল উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাওয়ার সাথে সাথে একটা ফসল থেকে আর একটা ফসল লাগানোর মধ্যবর্তী সময় কমে যাওয়ায় কৃষকরা বছরে এখন ২টা ফসলের স্থানে ৩টা ফসল অনায়াসেই করতে পারছে। এমনকি সুনির্দিষ্ট শস্য বিন্যাস ও স্বল্প জীবনকালের ফসল নির্বাচন করে যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে বছরে ৪টি ফসল পর্যন্ত করা সম্ভব হচ্ছে। বর্তমানে দেশে জমি তৈরির ৯০% কাজ পাওয়ার টিলার বা ট্রাক্টর দিয়ে করা হচ্ছে। সার প্রয়োগ ও আগাছা দমনের কাজে যন্ত্রের ব্যবহার শুরু হয়েছে এবং দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি পর্যায়ে ভাড়ার ভিত্তিতে ফসল কাটার যন্ত্র রিপার/কম্বাইন এর ব্যবহার শুরু হয়েছে। মাড়াই যন্ত্র বিশেষ করে ধান, গম ও ভুট্টাসহ সকল দানাদর ফসল মাড়াই কাজে মাড়াই যন্ত্র প্রায় ৯৫% ভাগ ব্যবহার হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের প্রফেসর ড. প্রকৌশলী এটিএম জিয়াউদ্দিন মনে করেন, কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ফলে ফসলের উৎপাদন খরচ যেমন অনেকাংশে কমে যায়, একই সাথে ফসলের নিবিড়তা ৫-২২ ভাগ বেড়ে যায়। এছাড়াও বীজ বপন যন্ত্র দ্বারা ফসল মাঠে বুনলে বীজ ২০ ভাগ সাশ্রয়ের পাশাপাশি সার ১৫-২০ সাশ্রয় হয়। অন্যদিকে ফসলের উৎপাদনও ১২-৩৪ ভাগ বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে কৃষকের মোট আয় বেড়ে যায় ২৯-৪৯ ভাগ।

ফসল উৎপাদনের ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কর্তনপূর্ব, কর্তনকালীন ও কর্তনোত্তর সময়ে ফসলের ক্ষতি হয়। বাংলাদেশে দানাশস্যে ফসল কর্তনোত্তর ক্ষতির পরিমাণ মোট উৎপাদনের ১২-১৫ ভাগ, যা ফল ও শাকসবজির ক্ষেত্রে প্রায় ২৫-৪০ ভাগ। এ ছাড়া অন্য আর একটি গবেষণায় জানা যায় যে, বাংলাদেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৭ ভাগ গম, ১২.০৫ ভাগ তেল বীজ, ২৫ ভাগ শাকসবজি এবং আলু, ১২.০৫ ভাগ ডাল ফসল এবং ১০.০৫ ভাগ মরিচ ফসলে কর্তনোত্তর ক্ষতি হয় শুধু দক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহারের না করার ফলে। বিগত ২০০৯-১০ অর্থবছরে সরকারের সঠিক পদক্ষেপের কারণে যেখানে ৩২.৫ মিলিয়ন মে. টন ধান উৎপাদিত হয়েছিল, সেখানে ফসল কর্তনোত্তর ক্ষতির পরিমাণ ছিল আনুমানিক ৪-৫ মিলিয়ন মে. টন, যা ২০০৮-০৯ অর্থবছরের খাদ্য সরবরাহ ও জোগানের ২.২ মিলিয়ন মে. টন ঘাটতির চেয়ে বেশি। কৃষি প্রকৌশলীগণ মনে করেন যে, খাদ্য সরবরাহ ও জোগানের মধ্যে যে ঘাটতির রয়েছে তা সঠিক ফসল কর্তনোত্তর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই কমানো সম্ভব। বাংলাদেশ ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কৃষি প্রকৌশলীদের মতে, ধান ফসল যদি যান্ত্রিক উপায়ে কর্তন বা রিপার দ্বারা কর্তন করা সম্ভব হয়, তবে কৃষকদের প্রায় ৮৪৫০০০ মে. টন ধান সাশ্রয় হবে। এক গবেষণায় জানা যায়, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩০,০০০ কোটি টাকার খাদ্য শস্য নষ্ট হয় শুধুমাত্র পরিকল্পিতভাবে ফসল কর্তন, ফসল কর্তনোত্তর ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে। কৃষি প্রকৌশলীদের গবেষণায় আরো জানা যায় যে, বিগত দশকে দেশে ফসল কর্তনোত্তর ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ২,৫০,০০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে প্রতিনিয়তই কৃষি কাজে শ্রমিকের অভাব দেখা দেয়ায় কৃষকরা সঠিক সময়ে ফসল জমিতে লাগাতে পারছে না ফলে কৃষকদের মাঝে কৃষি কাজে যন্ত্র ব্যবহারের ব্যাপক চাহিদা পরিলক্ষিত হচ্ছে। কৃষি কাজের এ অবস্থার কারণে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত কৃষি যন্ত্রপাতির চাহিদা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। স্থানীয়ভাবে তৈরি এসব কৃষি যন্ত্রপাতির চাহিদার বৃদ্ধির ফলে গড়ে ওঠেছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরি কারখানা। বারির ফার্ম মেশিনারি অ্যান্ড পোস্টহারভেস্ট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এক জরিপে দেখা গেছে, কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের শুধুমাত্র বারি গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্র ও মাড়াই যন্ত্র ব্যবহারের ফলে ইউরিয়া সাশ্রয় ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি সাশ্রয় বাবদ ৭৩৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব।


বর্তমানে দেশে কৃষি যন্ত্র প্রস্তুতকারী অনেক শিল্প কারখানা গড়ে উঠলেও এসব শিল্প কারখানায় দক্ষ জনগোষ্ঠীর অভাবে এদের উৎপাদিত যন্ত্রপাতির মানও তেমন ভালো নয়, যার ফলে মাঠে কৃষিযন্ত্রের প্রয়োজনীয় কার্যদক্ষতা পাচ্ছে না কৃষকরা।  দেশে ছোট বড় প্রায় ৮০০টি কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরি কারখানা বারি এবং ব্রি মডেলে কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরি করছে। এছাড়াও ৭০টি ফাউন্ডারি সপ, ১৫০০টি ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ তৈরি কারখানা এবং ২০০০০টি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কারখানা এই সেক্টরের সাথে জড়িত (প্রফেসর ড. মো. মঞ্জুরুল আলম, ২০১২)। এর ফলে দেশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কারখানা গড়ে ওঠার পাশাপাশি আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। বাংলাদেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ক্ষেত্রে বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও প্রয়োজনীয় সরকারি উদ্যোগ ও কার্যকরী যথাযথ অবকাঠামো না থাকায় এ সেক্টরের ক্রমবিকাশ যতটুকু গড়ে ওঠা দরকার তা গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে না। তবে আশার কথা বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত কৃষি যন্ত্রপাতি মাঠ পর্যায়ে প্রচুর জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। বারির এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ১০ বছরের উদ্ভাবিত হাইস্পিড রোটারি টিলার ৪,০০০টি, বারি বীজ বপন যন্ত্র ১,০০০টি, গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্র ১৬,০০০টি, ধান, গম কর্তন যন্ত্র ১০০টি, শস্য মাড়াই যন্ত্র ৪,০০,০০০টি, ভুট্টা মাড়াই যন্ত্র ৪,০০০টি, শস্য কর্তন যন্ত্র ২০০টি কৃষকের মাঠে সঠিক কর্মদক্ষতার সাথে কাজ করছে।     

যেহেতু দেশে এখন পর্যন্ত কৃষি যান্ত্রিকীকরণ সেক্টরটি গড়ে উঠেছে বিচ্ছিন্নভাবে, তাই বর্তমানে এর সঠিক অবস্থা নিরূপণ করা সম্ভব নয়। তবে বিছিন্নভাবে এসব তথ্য থেকেই এর প্রয়োজনীয়তা, চাহিদা, প্রসার ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সহজেই অনুধাবন করা যায়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের প্রফেসর ড. মো. মঞ্জুরুল আলমের ২০১২ সালের এক তথ্যানুযায়ী দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর ৭১.১৬  টাকার কৃষি যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য কৃষি যন্ত্রাংশ লেনদেন হয় তার মধ্যে শুধুমাত্র কৃষি যন্ত্রপাতি খাতে ৮০ বিলিয়ন টাকার লেনদেন হয়। এর মধ্যে দেশে তৈরি কৃষি যন্ত্রপাতি খাতে লেনদেন হয় ৩৩.৮৫ বিলিয়ন টাকা। পাওয়ার টিলার খাতে ১৩০০০ মিলিয়ন টাকা, ট্রাক্টর খাতে ৫৫২৫ মিলিয়ন টাকা, সেন্টিফিউগাল পাম্প খাতে ১৪০০ মিলিয়ন টাকা, কয়েক প্রকার ইঞ্জিনের খাতে ২০০০০ মিলিয়ন টাকা, মাড়াই যন্ত্র খাতে ৬৭০ মিলিয়ন টাকা, ম্প্রেয়ার যন্ত্রাংশ খাতে ৪২ মিলিয়ন টাকা, ইঞ্জিন, পাওয়ার টিলার ও পাম্প স্প্রেয়ার যন্ত্রাংশ খাতে ৩২০০ মিলিয়ন টাকার লেনদেন হচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৬৫০০০০ পাওয়ার টিলার ব্যবহৃত হচ্ছে এবং প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৬০ হাজার পাওয়ার টিলার আমদানি হচ্ছে। অন্য দিকে অগভীর নলকূপের জন্য ব্যবহৃত সেন্ট্রিফিউগাল পাম্পের সরবরাহ প্রধানত নির্ভর করছে দেশের স্থানীয় প্রস্তুতকারকদের ওপর। বর্তমানে প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার অগভীর নলকূপ রয়েছে এবং প্রতি বছর এর পাম্পের চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার। দেশে ব্যবহৃত স্পেয়ার সমূহের মধ্যে শুধুমাত্র পাওয়ার স্প্রেয়ার ব্যতীত প্রায় সকল প্রকার হস্ত ও পা চালিত স্প্রেয়ার বর্তমানে দেশেই প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রতি বছর এর চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার। দেশে প্রস্তুতকৃত স্প্রেয়ারগুলোর মধ্যে শতকরা ৩০ ভাগ লেনদেন হচ্ছে ঢাকায় এবং বাকি শতকরা ৭০ ভাগ লেনদেন হচ্ছে দেশের অন্যান্য জেলায়। দেশে ব্যবহৃত মাড়াই যন্ত্রগুলোও এখন দেশের স্থানীয় কারখানাগুলোতে তৈরি করা হচ্ছে। দেশে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের মাড়াই যন্ত্রের সংখ্যা এখন ৪ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।এবং প্রতি বছর এর চাহিদা প্রায় ৬০ হাজার। এছাড়াও দেশে অন্যান্য কৃষি যন্ত্রপাতির চাহিদা দিন দিন উচ্চহারে বেড়েই চলেছে। দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর আজ এর ওপর নির্ভর করে জীবিকা অর্জন করছে। তবে আরো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এ সেক্টরে আরো দ্রুত প্রসার ঘটানো সম্ভব।

দেশের কৃষি যন্ত্রাংশের ওপর মাঠপর্যায়ে গবেষণারত কৃষি যান্ত্রিকীকরণ বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের প্রফেসর ড. প্রকৌশলী এটিএম জিয়াউদ্দিন এর তথ্যানুসারে আশির দশকের গোড়ার দিকে দেশীয় কারখানার যন্ত্রাংশ উৎপাদন শুরু হয়। পুরনো ঢাকার জিনজিরা, ধোলাইখাল টিপু সুলতান রোড, নারায়ণগঞ্জের ডেমরায় বিপুল পরিমাণে কৃষি যন্ত্র উৎপাদন শুরু হয়। বর্তমানে বগুড়া, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের ওয়ার্কশপে এখন প্রচুর পরিমাণে মানসম্মত যন্ত্রাংশ তৈরি হচ্ছে। দেশীয় এরকম ছোট ছ্ােট শিল্প কারখানা ৮৬ সালে ঘোষিত প্রথম শিল্পনীতিতে শিল্পায়নে জাতীয় মডেল হিসাবে স্থান পায়। এ কারখানায় বিদেশ হতে আমদানি বিকল্প অসংখ্য ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ তৈরি হচ্ছে। এসব কৃষি যন্ত্রাংশের মধ্যে পাওয়ার পাম্প, পাওয়ার টিলারের টাইন, ব্লেড, লাইনার পিস্টন, পিস্টন রিং, গজপিন ও অন্যান্য স্প্রেয়ার পাম্প বেশি পরিমাণে উৎপাদিত হচ্ছে। এগুলো যন্ত্রাংশ তৈরির মধ্যে শুধুমাত্র বর্তমানে বগুড়ায় ৮০-৮৫ শতাংশ যন্ত্রাংশ তৈরি হয়। বগুড়ার এক স্থানীয় যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ীর সাথে আলাপকালে জানা যায়, বিদেশি যন্ত্রাংশ আমদানি করতে দেশ প্রায় হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে। এতে দেশীয় কারখানাগুলোর উৎপাদিত পণ্যের বাজার চরমভাবে মার খাচ্ছে। দেশীয় যন্ত্রাংশের সঠিক মূল্যয়ান না করে ঢালাওভাবে বৈধ ও অবৈধ পন্থায় আমদানি করা হচ্ছে এ সব যন্ত্রাংশ। অথচ দেশের বগুড়ায় তৈরি ক্ষুদ্র কৃষি যন্ত্রাংশ দেশের চাহিদা মিটিয়ে নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও ভারতসহ অন্যান্য দেশে রফতানি হচ্ছে। কৃষি যন্ত্রাংশ কারখানাগুলো বর্তমানে দেশের সম্ভাবনাময় একটি শিল্প। দেশে অবাধ আমদানি রোধ করে এ শিল্পকে আরো গতিশীল করতে প্রয়োজন সরকারি পদক্ষেপ। যে সকল ক্ষুদ্রযন্ত্রাংশ দেশে প্রস্তুত হচ্ছে সেসব আমদানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে দেশে উৎপাদিত যন্ত্রাংশের মান নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। সেই সঙ্গে দেশীয় কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের ওপর মূল্য সংযোজন কর হ্রাস বা প্রত্যাহার করা প্রয়োজন। স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশীয় ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ তৈরি শিল্পকারখানাগুলোকে উন্নত করার লক্ষ্যে এ শিল্পে প্রয়োজনীয় মূলধনের জোগান দিয়ে বিনিয়োগ উৎসাহিত করা জরুরি। এতে দেশের বেকার জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ এ শিল্পে যোগদানের সুযোগ পাবে। দেশ বিপুল পরিমাণের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে পারবে।

 

কৃষি সেক্টরের প্রতি স্তরে রোপণ থেকে শুরু করে শস্য ঘরে উঠানো পর্যন্ত কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বিপুল সম্ভাবনা আজ দেখা দিয়েছে। কিন্তু এ সব কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এখন প্রয়োজন সরকারি অবকাঠামো, কারিগরি জনবল ও সরকারি বেসরকারি সম্মিলিত উদ্যোগ। তবে বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার কৃষক পর্যায়ে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে বিভিন্ন বাধা দূর করতে এবং কৃষকদের এ ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দিতে ও উৎসাহিত করতে বিগত জুলাই ২০১০ সন হতে বারি, ব্রি ও ডিএইর সম্মিলিত ‘কৃষি যন্ত্রপাতি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প’ চালু করে। ফলে দেশের কৃষি সেক্টরের কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষি যন্ত্র শিল্প ব্যবস্থাপনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। এ প্রকল্প হতে বাজারমূল্যের ৬০ ভাগ ছাড়ে কৃষকের কাছে কৃষি যন্ত্র দেয়া হচ্ছে বারি ও ব্রি উদ্ভাবিত কৃষি যন্ত্রপাতি হাইস্প্রিড রোটারি টিলার, বীজ বপন যন্ত্র, বেড প্লান্টার, জমি নিড়ানি যন্ত্র, গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্র, ভুট্টা মাড়াই যন্ত্র, শস্য মাড়াই যন্ত্র, ধান-গম কর্তন যন্ত্র ও শস্য ঝাড়াই যন্ত্র যা কৃষি যান্ত্রিকীকরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। কৃষককে যন্ত্র ব্যবহারে আগ্রহী করছে। যন্ত্রের কার্যকরী ব্যবহার নিশ্চিতকরণের জন্য এ প্রকল্পে হতে ২৪টি উপজেলার প্রায় ২০০০ কৃষককে এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক মেকানিককে কৃষি যন্ত্রপাতির ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে সেই সাথে কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারকদেরও মানসম্পন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরির প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এছাড়াও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খামার যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প হতেও ২৫ ভাগ ভর্তুকি মূল্যে কৃষকদের মাঝে কৃষি যন্ত্রপাতি বিতরণ করা হচ্ছে। এসব প্রকল্প হতে খামার যান্ত্রিকীকরণ ফসল ফলনোত্তর কর্তনোত্তর ক্ষতি কমানোর বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান, মাঠ প্রদর্শনী আয়োজনের মাধ্যমে কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণ, কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ, কৃষি শিক্ষার প্রসার ইত্যাদি কর্মকাণের জন্য ব্যাপকভিত্তিক পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ পরিকল্পনা প্রণয়ন করলে  দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা হবে আশা করা যায়।

 

প্রকৌশলী মো. শোয়েব হাসান*
*পরিচালক, ডাল গবেষণা কেন্দ্র, ঈশ্বরদী, পাবনা


Share with :

Facebook Facebook