কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

সাগর উপকূলে সি-উইড চাষ

মেরিন ম্যাক্রোঅ্যালজি যা সি-উইড নামে বহুল পরিচিত। এটি সাগরের এক প্রকার তলদেশীয় জলজ উদ্ভিদ। সি-উইড বিশ্বব্যাপী একটি গুরুত্বপূর্ণ জলজ সম্পদ, পুষ্টিগুণের বিচারে যা বিভিন্ন দেশে খাদ্য ও শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। প্রাচ্যে বিশেষত জাপান, চীন ও কোরিয়ায় সনাতনভাবেই দৈনন্দিন খাদ্যে সি-উইড ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে এবং দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা ও ইউরোপে এর ব্যবহার বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। মূলত ৩ ধরনের সি-উইডের ভেতর বাদামি অ্যালজি (৬৬%), লাল অ্যালজি (৩৩%) ও সবুজ অ্যালজি (১%) খাদ্য হিসেবে সমাদৃত। মানব খাদ্য হিসেবে ব্যবহার ছাড়াও ডেইরি, ওষুধ, টেক্সটাইল ও কাগজ শিল্পে সি-উইড আগার কিংবা জেল জাতীয় দ্রব্য তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে বহুল ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া জমিতে সার, প্রাণী খাদ্য ও লবণ উৎপাদনেও সি-উইড ব্যবহার করা হয়। সি-উইডে প্রচুর পরিমাণে খনিজ দ্রব্য বিদ্যমান থাকায় খাদ্যে অনুপুষ্টি হিসেবে এর ব্যবহার গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।

 

বাংলাদেশের উপকূলে সি-উইড
বঙ্গোপসাগরের উপকূলে কক্সবাজার জেলার টেকনাফসহ সেন্টমার্টিন দ্বীপ ও বাকখালী মোহনার আশপাশের পাথুরে ও প্যারাবন এলাকায় জোয়ার-ভাটার অন্তর্বর্তী স্থানেই অধিকাংশ সি-উইড দেখতে পাওয়া যায়। সেন্টমার্টিন দ্বীপে প্রায় ১৪০ ধরনের ও বাকখালী-মহেশখালী চ্যানেলের মোহনায় ৫ প্রজাতি এবং প্যারাবন এলাকাতে ১০ প্রকারের সি-উইড পাওয়া যাওয়ার কথা শোনা যায়। সি-উইড জন্মানোর জন্য কিছু ভিত্তির প্রয়োজন পড়ে। সাধারণত বড় পাথর, প্রবাল, শামুক-ঝিনুক-পলিকিটের খোসা, প্যারাবনের গাছ-শিকড়, শক্ত মাটি কিংবা অন্য যেকোন শক্ত বস্তুর উপর সি-উইড জন্মে কক্সবাজার ও পার্বত্য অঞ্চলের রাখাইন ও অন্যান্য উপজাতীয় জনগোষ্ঠী সালাদ ও চাটনী হিসেবে সি-উইড আহার করে থাকে। স্থানীয় ভাষায় সি-উইড ‘হেজালা’ নামে পরিচিত। এ দেশে বাণিজ্যিকভাবে সি-উইড উৎপাদনের তথ্য পাওয়া না গেলেও বহু আগ  থেকে  উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাপ্য সি-উইড পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার হওয়ার কথা শোনা যায়। বাংলাদেশের ১৯টি উপকূলীয় জেলার ১৪৭টি উপজেলায় প্রায় ৩ কোটি লোক বসবাস করে যাদের অধিকাংশই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সামুদ্রিক সম্পদ আহরণের সঙ্গে জড়িত। তদুপরি এদেশে ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর পুষ্টির চাহিদা পূরণে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশের উপকূলীয় ৫০ মিটার গভীরতায় মহীসোপান অঞ্চলের আয়তন প্রায় ৩৭,০০০ বর্গকিলোমিটার। এ বিশাল সমুদ্র জলসিমা অত্যন্ত উর্বর এবং এখানে রয়েছে মৎস্যস¤পদসহ প্রচুর সামুদ্রিক সম্পদ। এসব সামুদ্রিক সম্পদ নবায়নযোগ্য হওয়ায় টেকসই প্রযুক্তির ব্যবহার ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় অনন্তকাল পর্যন্ত ব্যবহার করা সম্ভব। এ প্রেক্ষাপটে এশিয়ার অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের উপকূলে সি-উইড চাষের সম্ভাবনা উজ্জ্বল।


সি-উইড গবেষণা
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মো. জাফর ২০০৭ সালে এদেশে সি-উইড বা সামুদ্রিক শৈবাল নিয়ে সর্বপ্রথম গবেষণা বিশেষত সমুদ্র উপকূলে শৈবাল চাষ প্রযুক্তি বিষয়ে কাজ করেন। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের কক্সবাজারস্থ সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্র ২০১২ সাল হতে সি-উইড শৈবাল নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এর আগে সেন্টমার্টিন দ্বীপে সামুদ্রিক শৈবাল নিয়ে গবেষণা পরিচালিত হলেও ইনস্টিটিটিউটের সামুদ্রিক শৈবাল গবেষকদল কক্সবাজার সদর উপজেলার বাকখালী-মহেশখালী চ্যানেলের মোহনায় নুনিয়ারছড়া থেকে নাজিরারটেক পর্যন্ত সৈকত সংলগ্ন জোয়ার-ভাটা এলাকা ও মহেশখালী দ্বীপের বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিক গুরুত্বসম্পন্ন সি-উইডের প্রাকৃতিক উৎপাদন ক্ষেত্র শনাক্ত করেছে। প্রাপ্যতা ও স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে মানানসই প্রজাতিগুলোর পুষ্টিমান যাচাই এবং বাণিজ্যিক গুরুত্বের আলোকে খাদ্য উপাদান হিসেবে ব্যবহারের নিমিত্তে সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্র, কক্সবাজার কাজ করছে। বিজ্ঞানীরা সেন্টমার্টিন দ্বীপ, বাকখালী মোহনা ও টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, শাপলাপুর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০টি সি-উইডের নমুনা সংগ্র্র্রহ করে গবেষণাগারে সংরক্ষণ করেছে। এসব সামুদ্রিক শৈবালের মধ্যে প্রায় ১০টি প্রজাতি বাণিজ্যিক গুরুত্বসম্পন্ন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে Enteromorpha (সাগর পাতা), Caularpa racemosa (সাগর আঙুর), Hypnea spp. (সাগর সেমাই), Sargassum oligocystum (সাগর ঘাস), Padina tetrastromatica (সাগর ঝুমকা), Hydroclathrus clathratus (জিলাপি শেওলা), Catenella spp. (শৈবালমূললতা) এবং Porphyra spp. (লাল পাতা) অন্যতম। সেই সঙ্গে সেন্টমার্টিন দ্বীপে ৫টি নির্বাচিত সি-উইড প্রজাতি- ঝ. oligocystum, ঊ. intestinalis, চ.tetrastromatica, ঈ. racemosa ও ঐ. musciformis পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করা হচ্ছে। নারিকেলের রশি ও নাইলনের মাছ ধরার জাল ব্যবহার করে হরাইজনটাল নেট পদ্ধতিতে সি-উইড চাষ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। প্রজাতি ভেদে ৩-৪ মাসে প্রতি বর্গমিটার জালে কাঁচা শৈবালের উৎপাদন ৩০-৮০ কেজি। সারগাসামের লতা বা গাছ বড় হওয়ায় সবচেয়ে বেশি উৎপাদন পাওয়া যায়। চাষকৃত স্থানে জালের ভিত্তি স্থাপন করার ১ মাস পর থেকে প্রতি মাসে একবার সি-উইড আংশিক আহরণ করলে বেশি উৎপাদন পাওয়া সম্ভব। উপকূলের লেগুন বা আশ্রয়যুক্ত স্থান যা সাগরের প্রবল ঢেউ ও স্রোতের প্রভাবমুক্ত, দূষণমুক্ত পানি এবং জনউপদ্রব কম এমন জায়গা সামুদ্রিক শৈবাল চাষের জন্য উপযুক্ত। আমাদের জলবায়ুতে স্থানভেদে নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত প্রায় ৬ মাস সি-উইড চাষ করা যেতে পারে। তবে সামুদ্রিক শৈবাল চাষের সর্বোচ্চ অনুকূল অবস্থা বিদ্যমান থাকে জানুয়ারি থেকে মার্চ এই তিন মাস। সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের পাশাপাশি কোস্ট ট্রাস্ট নামে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান স্থানীয় জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করে সি-উইড চাষে সফলতা পেয়েছে।


সি-উইডের পুষ্টিমান
কক্সবাজার উপকূলে উৎপাদিত সি-উইডের প্রাথমিকভাবে ৬টি প্রজাতির সাধারণ পুষ্টিমান নির্ণয় করা হয়েছে (সারণি-১)।


সারণি- : নির্বাচিত সি-উইডে বিদ্যমান সাধারণ পুষ্টিমান (%)

                   

Hypnea sp

Hypnea musciformis

Padina tetrastromatica

Caulerpa racemosa

Sargassum oligocystum

Jania rubens

আর্দ্রতা

১৭.৪৫

২৪.৩১

১৫.৬৮

১৬.৩৬

২১.০৯

৮.৫৮

খনিজদ্রব্য

৩.৯৬

৯.৭৬

২৭.৯৫

৯.৯০

১২.৯৪

১৬.২৭

আমিষ

২২.৩১

১৩.৭৩

১২.২৯

২২.২৫

৮.১৯

৫.৭০

তৈল

০.৭৮

০.৩৪

০.৯৮

২.৬৫

০.৮৩

০.৪১

আঁশ

৪.১০

৫.৬০

৬.৮০

৪.৮০

৫.২০

৫.৯০

শর্করা

৫১.৪০

৪৬.২৬

৩৬.৩০

৪৪.০৪

৫১.৭৫

৬৩.১৪

 

উপরোক্ত সারণি থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, নির্বাচিত সামুদ্রিক শৈবালের প্রত্যেকটিই প্রচুর পরিমাণে অনুপুষ্টিস¤পন্ন। নির্বাচিত সব সামুদ্রিক শৈবালেই প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম ও লৌহ বিদ্যমান। বিভিন্ন মাছে যে পরিমাণ বিভিন্ন অনুপুষ্টি পাওয়া যায় (৫০-১,৪০০ পিপিএম) সি-উইডে তার থেকে বহুগুণ বেশি অনুপুষ্টি বিদ্যমান, যা আমাদের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুষ্টি চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে।

 

সি-উইডের খাদ্য
সি-উইডের প্রডাক্ট তৈরির জন্য ৩টি প্রজাতি- Hypnea, C. racemosa ও ঝ. crassifolium ব্যবহার করা যায়। C. racemosa (সামুদ্রিক আঙুর নামে পরিচিত) ভালোভাবে পরিষ্কার করে তাজা অবস্থায় সালাদ হিসেবে খাওয়া যায়। আমাদের খাদ্যকে সামুদ্রিক শৈবালসমৃদ্ধ করার জন্য হিপনিয়া প্রজাতিটি ব্যবহার করা হচ্ছে। যে কোনো খাদ্যে অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে অল্প পরিমাণে হিপনিয়ার পাউডার বা সিদ্ধ করা তরল সামুদ্রিক শৈবালের সামান্য পরিমাণ ব্যবহার করে খাদ্য উপাদানের পুষ্টিমান বৃদ্ধি করার ওপর গবেষণা কার্যক্রম চলমান। প্রাথমিকভাবে সামুদ্রিক শৈবালসমৃদ্ধ খাদ্য আইটেমগুলো হলো- সালাদ, স্যুপ, আচার, পিঠা, চানাচুর, জেলি, সস ইত্যাদি। সি-উইড কেবল খাদ্য বা শিল্পে কাঁচামাল নয় ডেকরেশন আইটেম হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। সি-উইড বা সামুদ্রিক শৈবাল চাষ প্রযুক্তি আমাদের দেশে সামুদ্রিক স ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি নতুন উদ্যোগ। সামুদ্রিক শৈবাল চাষের প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে উপকূলীয় জলাশয় চাষের আওতায় আনা সম্ভব। এতে দরিদ্র জনসাধারণের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি তাদের জীবন মানের উন্নয়ন ঘটবে। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর পুষ্টির চাহিদা পূরণে সি-উইড খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।

 

. মো. ইনামুল হক*
* মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্র, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, কক্সবাজার


Share with :

Facebook Facebook