কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

মিষ্টিআলুর পুষ্টি ও তুষ্টি

মিষ্টিআলুর ইংরেজি নাম Sweet potato এবং বৈজ্ঞানিক নাম Ipomoea batatus, পরিবার হলো Convolvulaceae. উৎপাদনের দিক দিয়ে বাংলাদেশের খাদ্য ফসলসমূহের মধ্যে মিষ্টিআলুর স্থান চতুর্থ। মিষ্টিআলু চাষ বেশ লাভজনক। চাষে খরচ কম, লাভ বেশি। এতে পোকামাকড় ও রোগবালাই নেই বললেই চলে। উৎপাদন ক্ষমতাও তুলনামূলকভাবে বেশি। মিষ্টিআলু বিশ্বের অধিক ফলনশীল ফসলের মধ্যে অন্যতম। এ ফসলটি অত্যধিক খরা সহিষ্ণু। মিষ্টিআলু ভাত ও আলুর  চেয়ে অধিক পুষ্টিকর। মিষ্টিআলু প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে হালুয়া, পায়েশ, ফিরনি, চিপস, জ্যাম, জেলি, মিষ্টি, ভর্তা, তরকারি এসব তৈরি করা যায়। দুধের সঙ্গে মিষ্টিআলু মিশিয়ে খেলে অন্য রকম স্বাদ লাগে। নদীর চরের বালু প্রধান মাটিতেও মিষ্টিআলু অধিকতর উপযোগী ফসল হিসেবে চাষ করা যায়। মিষ্টিআলুর পাতা বা শাক সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর তরকারি হিসেবে গ্রাম বাংলায় যুগ যুগ ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিশেষ করে শুঁটকি ছোটমাছ আর মাছের মাথা দিয়ে রান্না করলে বেশ স্বাদের হয়। মিষ্টিআলু জমি থেকে তুলে ৩-৪ মাস পর্যন্ত অনায়াসে রাখা যায়।


মিষ্টিআলুর পুষ্টিমান : অনেক ফসলের তুলনায় মিষ্টিআলুর পুষ্টিমান অনেক বেশি। খাবার যোগ্য প্রতি ১০০ গ্রাম মিষ্টিআলুতে পুষ্টিমান রয়েছে- জলীয় অংশ ৬৮.৫ গ্রাম; আঁশ ০.৮ গ্রাম; খাদ্যশক্তি ১২০ কিলোক্যালরি; আমিষ ১.৫-২.০০ গ্রাম; চর্বি ০.৭ গ্রাম; শর্করা ১৯-২৩ গ্রাম; ক্যালসিয়াম ৪৬ মিলিগ্রাম; লৌহ ০.৮ গ্রাম; বিটা ক্যারোটিন (ভিটামিন এ) ৪০০-১২,৩০০ আন্তর্জাতিক ইউনিট; ভিটামিন বি-১ ০.০৬ মিলিগ্রাম; ভিটামিন বি-২ ০.০২ মিলিগ্রাম; ভিটামিন সি ২৪.০ মিলিগ্রাম। অনেক ফসলে তুলনায় মিষ্টিআলুর পুষ্টিগুণ অনেক বেশি।


মিষ্টিআলুর জাত
এক সময় যখন মিষ্টিআলু আরও বেশি জনপ্রিয় এবং আবশ্যকীয় ছিল তখন বর্তমানের মতো এত আধুনিক উচ্চফলনশীল জাত ছিল না। কিন্তু বর্তমানে মিষ্টিআলুর অনেক জাত রয়েছে। জাতগুলো বৈশিষ্ট্য সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) হতে এ পর্যন্ত ১৩টি উচ্চফলনশীল মিষ্টিআলুর জাত উদ্ভাবন ও অবমুক্তায়ন করা হয়েছে। জাতগুলো হলো বারি মিষ্টিআলু-১ (তৃপ্তি), বারি মিষ্টিআলু-২ (কমলা সুন্দরী), বারি মিষ্টিআলু-৩ (দৌলতপুরী), বারি মিষ্টিআলু-৪, বারি মিষ্টিআলু-৫, বারি মিষ্টিআলু-৬, বারি মিষ্টিআলু-৭, বারি মিষ্টিআলু-৮, বারি মিষ্টিআলু-৯, বারি মিষ্টিআলু-১০, বারি মিষ্টিআলু-১১, বারি মিষ্টিআলু-১২, বারি মিষ্টিআলু-১৩। এবার জাতের বৈশিষ্ট্য এক এক করে বর্ণিত হলো।


বারি মিষ্টিআলু-১ (তৃপ্তি)
এ জাতের কাণ্ডের রঙ বেগুনি এবং লোমশ। কাণ্ডের অগ্রভাগ সবুজ, পাতা গাঢ় সবুজ। কন্দমূল সাদা, শাঁস হালকা হলদে ও নরম। মূলের ওজন ২০০-২৫০ গ্রাম, তবে কোন সময়ে একেকটি মূল ১.৫ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। কন্দমূল উপবৃত্তাকার। প্রতি ১০০ গ্রাম শাঁসে প্রায় ৪৫০ আ. ইউ ভিটামিন-এ আছে। জীবনকাল ১৪০-১৫০ দিন। স্বাভাবিক অবস্থায় এর ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় ৪০-৪৫ টন। বাংলাদেশের সব অঞ্চলে এ জাত চাষ করা যায়।


বারি মিষ্টিআলু-২ (কমলা সুন্দরী)
এ জাতের কাণ্ড সবুজ, পাতা কচি অবস্থায় বেগুনি, কাণ্ডের অগ্রভাগ বেগুনি ও পাতা বেগুনি, পাতার উল্টো দিকের শিরা বর্ণহীন। কন্দমূল লাল ও শাঁস কমলা বর্ণের। কন্দমূলের আকৃতি উপবৃত্তাকার। কন্দমূলের ওজন ১৮০-২২০ গ্রাম। শাঁস নরম। প্রতি ১০০ গ্রাম শাঁসে প্রায় ৭৫০০ আ. ইউ ভিটামিন এ আছে। জীবনকাল ১৪০-১৫০ দিন। উন্নত পদ্ধতিতে চাষ করলে হেক্টরপ্রতি ৪০-৪৫ টন ফলন হয়ে থাকে। বাংলাদেশের সব অঞ্চলে এটি চাষ করা যায়। প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য এ জাতটি উত্তম।

 

বারি মিষ্টিআলু-৩ (দৌলতপুরী)
এ জাতের কাণ্ড সবুজ, পাতা খাঁজকাটা ও সবুজ। কন্দমূল সাদা, শাঁস সাদা। কন্দমূলের আকৃতি লম্বাটে। কন্দমূলের ওজন ১৮০-২০০ গ্রাম। শুষ্ক বস্তুর পরিমাণ শতকরা ৩০ ভাগ। জীবনকাল ১৪০-১৫০ দিন। উন্নত পদ্ধতিতে চাষ করলে হেক্টরপ্রতি ফলন ৩০-৩৫ টন পর্যন্ত হয়। বাংলাদেশের সব অঞ্চলে এ জাত চাষ করা যায়। জাতটির মিষ্টিআলুর উইভিল আক্রমণরোধ ক্ষমতা আছে।


বারি মিষ্টিআলু-৪
এ জাতের কাণ্ড সবুজ, কাণ্ডের অগ্রভাগ বেগুনি, পাতা সবুজ, কচিপাতা বেগুনি। কন্দমূলের ওজন ১৭৫-১৯৫ গ্রাম ও আকৃতি উপবৃত্তাকার। প্রতি ১০০ গ্রাম শাঁসে প্রায় ১০৫০ আন্তর্জাতিক ইউনিট ভিটামিন-এ আছে। জীবনকাল ১২০-১৩০ দিন। উন্নত পদ্ধতিতে চাষ করলে হেক্টরপ্রতি ফলন হয় ৪০-৪৫ টন। বাংলাদেশের সব অঞ্চলে এ জাত চাষ করা যায়। জাতটিতে মিষ্টিআলুর উইভিল আক্রমণ কম হয়। বিশেষ করে যশোর ও খুলনায় এ জাতটি আগাম চাষ করা যায়।

 

বারি মিষ্টিআলু-৫
এ জাতের কাণ্ড ও কাণ্ডের অগ্রভাগ সবুজ ও কাণ্ড লোমশ হয়। পাতা সবুজ ও সামান্য খাঁজকাটা। কন্দমূলের ওজন ১৮০-২২০ গ্রাম। প্রতি ১০০ গ্রাম শাঁসে প্রায় ১ হাজার আ. ইউ ভিটামিন-এ আছে। জীবনকাল ১২০-১৩০ দিন। সাধারণ অবস্থায় এর ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় ৩৫-৪০ টন। বাংলাদেশের সব অঞ্চলে এ জাত চাষ করা যায়। জাতটিতে মিষ্টিআলুর উইভিল আক্রমণ কম হয়।

 

বারি মিষ্টিআলু-৬
এ জাতের কাণ্ড পুরু ও হালকা সবুজ। কাণ্ডের উপরিভাগ কিছুটা লোমশ। পাতা বড়, খাঁজ কাটা ও সবুজ। কন্দমূলের আকৃতি উপবৃত্তাকার। কন্দমূলের ত্বক হলুদ। শাঁস গাঢ় ক্রিম বর্ণের। শাঁস শুষ্ক এবং প্রতি ১০০ গ্রাম শাঁসে প্রায় ৮০০ আ. ইউ. ভিটামিন-এ রয়েছে। কন্দমূলের গড় ওজন ২২০ গ্রাম। জীবনকাল ১২০-১৩০ দিন। উন্নত পদ্ধতিতে চাষ করলে হেক্টরপ্রতি ৪০-৫০ টন ফলন পাওয়া যায়। বাংলাদেশের সব অঞ্চলে এ জাত চাষ করা যায়। জাতটির মিষ্টিআলুর উইভিল আক্রমণ রোধ ক্ষমতা আছে। জাতটিতে লবণাক্ততা সহনশীল গুণাগুণ রয়েছে।

 

বারি মিষ্টিআলু-৭
এ জাতের কাণ্ড বেগুনি বর্ণের। পাতা সরল ও সম্পূর্ণ। কচি ও বয়স্ক পাতার রঙ সবুজ, কিন্তু পাতার উল্টো দিকের শিরা বেগুনি বর্ণের। কন্দমূলের আকৃতি উপবৃত্তাকার। কন্দমূলের ত্বক সাদা। শাঁস ক্রিম বর্ণের। শাঁস শুষ্ক এবং প্রতি ১০০ গ্রাম শাঁসে প্রায় ৭০০ আ. ইউ. ভিটামিন-এ রয়েছে। জীবনকাল ১২০-১৩০ দিন। উন্নত পদ্ধতিতে চাষ করলে হেক্টরপ্রতি ৪০-৫০ টন ফলন পাওয়া যায়। বাংলাদেশের সব অঞ্চলে এ জাত চাষ করা যায়। একটি খরা সহিষ্ণু জাত। জাতটিতে উইভিলের আক্রমণ কম হয়। জাতটিতে লবণাক্ততা সহনশীল গুণাগুণ রয়েছে।


বারি মিষ্টিআলু-৮
এ জাতের লতা ও পাতার বর্ণ সবুজ। কন্দমূলের চামড়ার বর্ণ লাল, শাঁসের বর্ণ হলুদ। কন্দমূলের গড় ওজন ১৬০ গ্রাম। শুষ্ক বস্তুর পরিমাণ শতকরা ৩৫.৩ ভাগ। প্রতি ১০০ গ্রাম শাঁসে প্রায় ৬৫০ আন্তর্জাতিক ইউনিট। ভিটামিন-এ রয়েছে। জীবনকাল ১২০-১৩৫ দিন। উন্নত পদ্ধতিতে চাষ করলে হেক্টরপ্রতি ৪০-৫০ টন ফলন পাওয়া যায়। বাংলাদেশের সব অঞ্চলে এ জাত চাষ করা যায়। জাতটি খরা সহিষ্ণু। জাতটিতে উইভিলের আক্রমণ কম হয়।


বারি মিষ্টিআলু-৯
এ জাতের লতা ও পাতার বর্ণ সবুজ এবং পাতা সামান্য খাঁজ কাটা। কন্দমূলের চামড়ার বর্ণ গাঢ় হলুদ, শাঁসের বর্ণ মাঝারি কমলা। কন্দমূলের গড় ওজন ১৬০ গ্রাম। শুষ্ক বস্তুও পরিমাণ শতকরা ৩৫.৬ ভাগ। প্রতি ১০০ গ্রাম শাঁসে প্রায় ৭৩০ আ. ইউ. ভিটামিন-এ রয়েছে। জীবনকাল ১২০-১৩৫ দিন। উন্নত পদ্ধতিতে চাষ করলে হেক্টরপ্রতি ৪০-৫০ টন ফলন পাওয়া যায়। বাংলাদেশের সব অঞ্চলে এ জাত চাষ করা যায়। জাতটি খরা সহিষ্ণু। জাতটিতে উইভিলের আক্রমণ কম হয়। জাতটিতে লবণাক্ততা সহনশীল গুণাগুণ রয়েছে।


বারি মিষ্টিআলু-১০
জাতটির লতার কা- ও পাতা সবুজ, পাতার কিনারা, বোঁটা ও কা- হালকা বেগুনি রঙের। কন্দমূল উপবৃত্তাকার, চামড়া গাঢ় বাদামি, শাঁস হলুদাভ। কন্দমূলের গড় ওজন ১৮০-২০০ গ্রাম, শুষ্ক বস্তুর পরিমাণ ২৮.১১%, ভিটামিন-এ ৪০০ আ.এ./১০০ গ্রাম। জীবনকাল ১২০-১৩০ দিন। সাধরণ অবস্থায় এর ফলন হেক্টরপ্রতি ৩৫-৪০ টন। বাংলাদেশের সব অঞ্চলে এ জাতের চাষ করা যায়। জাতটিতে উইভিলের আক্রমণ কম হয়।


বারি মিষ্টিআলু-১১
লতার কা- বেগুনি ও পাতা সবুজ, কন্দমূলের চামড়া লাল ও শাঁস হালকা হলুদ, কন্দ মূলের গড় ওজন ১৮০-২০০ গ্রাম, শুষ্ক বস্তুর পরিমাণ ৩৫.৪৪%, ভিটামিন-এ ৫০০ আ. এ./১০০ গ্রাম। সাধরণ অবস্থায় এর ফলন হেক্টরপ্রতি ৩৫-৪০ টন। বাংলাদেশের সব অঞ্চলে এ জাতের চাষ করা যায়। জাতটিতে উইভিলের আক্রমণ কম হয়।

 

বারি মিষ্টিআলু-১২
লতার কা- ও পাতা সবুজ, কন্দমূলের চামড়া লালচে ও শাঁস কমলা রঙের, কন্দ মূলের গড় ওজন ১৬০-১৮০ গ্রাম, শুষ্ক বস্তুর পরিমাণ ২৯.৪৬%, ভিটামিন-এ ১২,৩০০ আ. এ./১০০ গ্রাম। সাধরণ অবস্থায় এর ফলন হেক্টরপ্রতি ৩৫-৪০ টন। বাংলাদেশের সব অঞ্চলে এ জাতের চাষ করা যায়। জাতটিতে উইভিলের আক্রমণ কম হয়।

 

বারি মিষ্টিআলু-১৩
লতার কা- বেগুনি ও পাতা সবুজ এবং খাজকাটা, কন্দমূলের চামড়া গাঢ় হলুদ ও শাঁস গাঢ় হলুদ রঙের, কন্দ মূলের গড় ওজন ১৬০-১৮০ গ্রাম, শুষ্ক বস্তুর পরিমাণ ২৮.৯৩%, ভিটামিন-এ ৮,৮০০ আ. এ./১০০ গ্রাম। জীবনকাল ১২০-১৩০ দিন। সাধরণ অবস্থায় এর ফলন হেক্টরপ্রতি ৩৫-৪০ টন। বাংলাদেশের সব অঞ্চলে এ জাতের চাষ করা যায়। জাতটিতে উইভিলের আক্রমণ কম হয়।


উৎপাদন প্রযুক্তি
মিষ্টি আলুর উৎপাদন প্রযুক্তি অনেক ফসলের তুলনায় সহজ এবং কম খরচি। একটু সচেতনভাবে চাষ করতে পারলে খুব ভালো ফলাফল পাওয়া যায়।

 

মাটি ও জমি : মাটি পানি নিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত বেলে দো-আঁশ ও অপেক্ষাকৃত জৈবসারযুক্ত উঁচু ও উর্বর মাটিতে মিষ্টিআলু ভালো জন্মে। কাদা মাটি, ক্ষার ও লবণাক্ত মাটি মিষ্টিআলু চাষের জন্য উপযুক্ত নয়। নদীর চর অঞ্চলে পলিময় জমিতেও মিষ্টিআলু ভালো জন্মে। এ ফসলটি অত্যধিক খরা সহিষ্ণু। মিষ্টিআলু চাষের জন্য যে মাটিতে পানি জমে না এবং জমি থেকে পানি সহজে বের করে দেয়ার জন্য ভালো ব্যবস্থা আছে এমন জমি নির্বাচন করতে হবে।


জমি তৈরি চারা উৎপাদন ও রোপণ : মিষ্টিআলুর জমি ৫-৬ বার চাষ ও মই দিয়ে তৈরি করতে হবে। জমি থেকে আগাছা ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। রোপণের জন্য প্রয়োজন অনুসারে লতা উৎপাদন করতে হবে। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে ফসল সংগ্রহের পর মিষ্টিআলুর লতা অথবা কন্দ উঁচু জমিতে বীজতলায় রোপণ করে রাখতে হবে। রোপণ মৌসুমে এসব বীজতলা থেকে লতার শাখাকলম তৈরি করে জমিতে রোপণ করতে হবে। মিষ্টিআলুর বীজতলা উঁচু ও আলো-বাতাসময় হতে হবে। মিষ্টিআলুর লতাকে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার লম্বা টুকরা করে বীজতলায় লাগাতে হবে। প্রত্যেকটি লতার ৩ ভাগের ১ ভাগ মাটির ওপরে রেখে বাকি ২ ভাগ মাটির নিচে লাইনে ঘন করে রোপণ করতে হবে। ৩ থেকে ৪ মাসের মধ্যে বীজতলা লতায় ভরে উঠে এবং কার্তিক অগ্রহায়ণ মাসে মিষ্টিআলু উৎপাদনের জন্য এসব ডগার লতা জমিতে লাগাতে হবে। অধিক ফলন পেতে হলে কার্তিক হতে অগ্রহায়ণ মাসে মিষ্টিআলুর লতা জমিতে লাগাতে হবে। মিষ্টিআলু আমাদের দেশে সাধারণত শীতকালে চাষ করা হয়। লতার সাহায্যে মিষ্টিআলুর বংশবিস্তার করা হয়। হেক্টরপ্রতি লতার প্রয়োজন হয় ৫৬ হাজার। মিষ্টিআলুর লতা লাইন করে জমিতে লাগাতে হবে। লতা টুকরা করে কেটে রোপণ করতে হবে। লতার মাথা থেকে ১ম ও ২য় খণ্ড রোপণ করা উচিত। লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব ৬০ সেন্টিমিটার এবং লতা থেকে লতার দূরত্ব ৩০ সেন্টিমিটার। সমতল পদ্ধতিতে লাইন তৈরি করে লাগাতে হবে যাতে ২-৩টি গিঁট মাটির নিচে থাকে।


সারের পরিমাণ ও সার প্রয়োগ পদ্ধতি : মিষ্টিআলু যেহেতু মূল জাতীয় ফসল তাই মাটি ঝুরাঝুরা এবং বেশি পরিমাণে জৈবসার ব্যবহার করতে হবে। আর ভালো ফলনের জন্য টিএসপি এবং এমওপি বেশি ব্যবহার করতে হবে। জমির অবস্থা উর্বরতা এবং প্রকৃতি ভেদে সারের বিভিন্ন মাত্রা ব্যবহার করতে হয়। সাধারণ গড় হলো প্রতি হেক্টর জমিতে মিষ্টিআলু চাষে যে পরিমাণ সার ব্যবহার করা প্রয়োজন তা হলো- গোবর ৮-১০ টন, ইউরিয়া ১৬০-১৮০ কেজি, টিএসপি ১৫০-১৭০ কেজি, এমওপি ১৮০-২০০ কেজি। সম্পূর্ণ গোবর, টিএসপি এবং অর্ধেক ইউরিয়া ও এমওপি সার শেষ চাষের সময় জমিতে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। বাকি অর্ধেক ইউরিয়া এবং এমওপি সার রোপণের ৬০ দিন পর লাইনের পাশ দিয়ে পার্শ্ব প্রয়োগ করতে হবে।


সেচ : মিষ্টিআলুর লতা লাগানোর পর পরই জমিতে হালকা সেচের ব্যবস্থা করা গেলে লতা বেঁচে যায় ও তাড়াতাড়ি শিকড় ছাড়ে। জমির আর্দ্রতার ওপর নির্ভর করে ২-৩টি সেচ দিতে হবে। মিষ্টিআলু গাছ মাটিতে লেগে গেলে ৩০, ৬০ এবং ৯০ দিন পর সেচ দেয়া উচিত। খেয়াল রাখতে হবে কখনো যেন কোনোভাবে মিষ্টিআলু জমিতে পানি না জমে থাকে।


অন্তর্বর্তীকালীন পরিচর্যা : ইউরিয়া সার পার্শ্ব প্রয়োগের সময় ২ বার মাটি দিয়ে গাছের গোড়া বেঁধে দিতে হবে। চারা রোপণের ৫০-৬০ দিন পর থেকে মাসে অন্তত ১ বার লতা নেড়ে চেড়ে দিতে হবে। এতে মিষ্টিআলুর লতার পর্ব থেকে শিকড় গজানো তথা বাজারজাত অনুপযোগী কন্দমূল উৎপাদন এড়ানো সম্ভব এবং ফলশ্রুতিতে কন্দের আকার ও ফলন বাড়ে।


বালাই ব্যবস্থাপনা : আলুর তুলনায় মিষ্টিআলুতে তুলনামূলকভাবে কম বালাইয়ের আক্রমণ হয়। বিশেষ উল্লেখযোগ্য কিছু বালাইয়ের মধ্যে রয়েছে।
 

মিষ্টিআলুর বিছা পোকা : প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী বিছা পোকার মথ মিষ্টিআলু গাছের পাতায় ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে অসংখ্য বিছার জন্ম হয়। পাতা খেয়ে ফসলের বিশেষ ক্ষতি করে থাকে। এ পোকা দমনের জন্য ১২ লিটার পানিতে চা চামচের ৪ চামচ ভেপোনা ভালোভাবে মিশিয়ে ছিটানো যেতে পারে। তাছাড়া ডায়াজিনন তরল ওষুধও এ পোকা দমনে সাহায্য করে।


উড়চুঙ্গা পোকা : আমাদের দেশে মিষ্টিআলুর জমিতে উড়চুঙ্গা পোকার আক্রমণ বেশি হয়ে থাকে। এ পোকা মিষ্টিআলুর গায়ে গর্ত করে খেতে থাকে। উড়চুঙ্গা পোকা দমনের জন্য ক্লোরোপাইরিফস ৪৮ ইসি প্রতি লিটার পানিকে ২ মিলিলিটার ওষুধ মাটিতে প্রয়োগ করলে বেশ ভালো ফল পাওয়া যায়।


উইভিল পোকা : মিষ্টিআলুর উইভিল পোকা প্রায় সব দেশে ফসলকে আক্রমণ করে ক্ষতি করে থাকে। আমাদের দেশেও এ পোকার আক্রমণ মিষ্টিআলু সংরক্ষণের সময় বেশি দেখা যায়। এ পোকা মিষ্টিআলু খেয়ে প্রচুর পরিমাণে ছিদ্র করে থাকে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত আলুগুলো মানুষ ও পশু খাদ্যের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। গ্রীষ্মকালে এ পোকার আক্রমণ বেশি দেখা যায়। মিষ্টিআলু গাছের গোড়ার আলুতে মাটি তুলে দিলে এ পোকা দমন করা যায়। আক্রান্ত মিষ্টিআলু ভালো আলুর সঙ্গে রাখা যাবে না। জমি তৈরির সময় হেক্টরপ্রতি কার্বোফুরান ৫ জি বা ডায়াজিনন ১৪ জি প্রয়োগ করে হালকা সেচ দিতে হবে। ফেরোমন ট্র্যাপ ব্যবহার করে এ পোকার আক্রমণ বহুলাংশে কমানো যায়।


ইঁদুরের আক্রমণ : ইঁদুরের গর্তে বিষাক্ত আলুমিনিয়াম ফসফাইড বড়ি দিয়ে গর্তের মুখ ভালো করে বন্ধ করে দিলে ইঁদুর মারা যায়। এজন্য নতুন গর্তে গ্যাস বড়ি দিয়ে আশপাশের সকল গর্তে-নালার মুখ মাটি দিয়ে শক্ত করে বন্ধ করে দিতে হবে।


মিষ্টিআলুর কালচে রোগ : কালচে রোগ মাঠের গাছকে অথবা সংরক্ষণকালে মিষ্টি আলুকে আক্রমণ করে থাকে। আক্রান্ত মিষ্টি আলুর ওপর ঘন কালো গোলাকার দাগের সৃষ্টি হয় এবং ধীরে ধীরে তা সমস্ত আলুতে ছড়িয়ে পড়ে এবং আলুতে পচন ধরায়। যে কোনো ছত্রাক প্রতিরোধক ওষুধ ব্যবহার করলে এ রোগ দমন করা যায়।
 

সংগ্রহ ও ফলন : চারা রোপণের পর ১৩০-১৫০ দিনের মধ্যে মিষ্টিআলু উঠাতে হবে। ফসল লাগানো থেকে শুরু করে ফসল তোলা পর্যন্ত প্রায় ৫ মাস সময় লাগে। মিষ্টিআলুর ফলন নির্ভর করে আলুর জাত, আবহাওয়া ও উৎপাদন পদ্ধতির ওপর। আমাদের দেশে মিষ্টিআলুর গড় ফলন প্রতি হেক্টরে ১০-১৫ টন। আমাদের দেশে মিষ্টিআলু চাষে তেমন একটা যত্ন নেয়া হয় না। যদি ধান, পাট, গোল আলুর মিষ্টিআলু উৎপাদনে যত্ন নেয়া হতো তাহলে আমাদের দেশে মিষ্টিআলুর উৎপাদন অনেকগুণ বৃদ্ধি পেত। সামান্য যত্ন নিলে আমাদের দেশে যেখানে প্রতি হেক্টরে ১৫ থেকে ২০ টন মিষ্টিআলু উৎপাদন হয়ে থাকে। উন্নত জাতের মিষ্টি আলু উন্নত পদ্ধতিতে উৎপাদন করলে হেক্টরপ্রতি ফলন আমাদের দেশে ৪০ থেকে ৫০ টন পর্যন্ত হতে পারে।


মিষ্টি আলু অপ্রধান ফসল হলেও প্রধান ফসলের চেয়ে বেশি উপকার করে। অনেক ফসলের তুলনায় কম খরচ কম ঝামেলাবিহীন কিন্তু বেশি লাভজনক এ ফসলটিকে আরও যত্ন আন্তরিকতা আর সতর্কতার সঙ্গে আবাদ করতে পারলে আমরা আমাদের উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারতাম। আশা করি মিষ্টিআলুর চাষ এলাকা বাড়বে এবং বেশি উৎপাদন করে বেশি খেয়ে আমরা আরও পুষ্টিসমৃদ্ধ হব।

 

কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম*
* উপপরিচালক (গণযোগাযোগ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫


Share with :

Facebook Facebook