কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

দারিদ্র্য বিমোচনে আখ চাষ

খাদ্য নিরাপত্তা জনগণের মৌলিক এবং প্রাথমিক চাহিদা। আমাদের কারিগরি শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের অভাব, নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরিতে ইচ্ছা ও পুঁজির স্বল্পতা, উন্নত প্রযুক্তি সাধারণ জনগণের দোরগোড়ায় না পৌঁছানো, সর্বোপরি বিভিন্ন প্রতিকূল কারণে উপযোগী না হওয়ায় উন্নত প্রযুক্তি গ্রহণে সাধারণ কৃষাণ-কৃষাণীদের অনিচ্ছাই আমাদের দারিদ্র্যের মূল কারণ।
দেশের সরকার, সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিশেষকরে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো দারিদ্র্য হ্রাসকরণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট আখের নতুন নতুন উন্নত জাত উদ্ভাবন ও লাভজনক পদ্ধতিতে আখ চাষ বিষয়ক বিভিন্ন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং তা কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর মাধ্যমে চিনি ও গুড় এর চাহিদা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচনে বেশ ভূমিকা রেখে চলেছে।


আখ চাষের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন সহজেই সম্ভব। শুধু এ বিষয়ে আমাদের সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের তৎপরতা দরকার। কারণ আখ চাষের জন্য বিশেষত চিনিকলবহির্ভুত গুড় উৎপাদন এলাকায় কিংবা চিবিয়ে খাওয়া আখ উৎপাদন এলাকায় আখ চাষ নিয়ে কথা বলার জন্য সাধারণত কেউ থাকে না। তাই আখ চাষ করে যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায় তা অনেকেরই অজানা। অতএব প্রথমেই বলি কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিয়ে।


আখ এমন একটি ফসল যার রোপণকাল থেকে পরিপক্বতা পর্যন্ত ১০-১৪ মাস সময় প্রয়োজন হয়। এ সময়ে বিভিন্ন পরিচর্যার ওপর আখের সঠিক বৃদ্ধি ও গড় উৎপাদন নির্ভর করে। আখের পরিচর্যা শ্রমিক নির্ভরশীল বিধায় আখচাষের মাধ্যমে কৃষি শ্রমিকদের সারা বছর কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব। এক হেক্টর আখের জমি লাগানো থেকে কাটা পর্যন্ত প্রায় ৬০০ শ্রমিক-দিবসের প্রয়োজন হয়। অন্য কোন ফসল আবাদের জন্য এত শ্রমিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। করে দেশের দারিদ্র্যপীড়িত এলাকা, যেখানে কৃষি শ্রমিকদের কাজ ধানচাষের উপর নির্ভরশীল, আগস্ট থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত তারা (কৃষি শ্রমিকরা) কাজের অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করে, সেখানে আখচাষের মাধ্যমে বেকার শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব।


চিনিকলবহির্ভূত এলাকায় আখ ও সাথীফসল চাষ বৃদ্ধির মাধ্যমে যেমন কৃষি শ্রমিকদের কাজের নিশ্চয়তা দেয়া সম্ভব তেমনি উৎপাদিত আখ, গুড় উৎপাদনে ব্যবহার করে চিনিকলের ওপর চাপ কমানোর মাধ্যমে গুড় শিল্পের বিকাশ ঘটিয়ে দেশের চিনি ও গুড়ের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখা সম্ভব। এতে গুড় শিল্পে মানুষের কাজ করার সুযোগ বৃদ্ধির সাথে সাথে চিনি আমদানির পরিমাণ কমিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার খরচ বাঁচানো সম্ভব।


আখ ফসলের কোন অংশই ফেলনা নয়। আখক্ষেত পরিচর্যাকালীন যে সমস্ত শুকনো পাতা ও মরাগাছ মাঠ থেকে অপসারণ করা হয় তা বিক্রি করে আখচাষি কিছু নগদ অর্থ উপার্জন করতে পারে। কারণ বর্ষা মৌসুমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জ্বালানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। আখচাষের মাধ্যমে প্রয়োজনের সময় এসব জ্বালানির জোগান পাওয়া সম্ভব। আর তাছাড়া আখ কাটার সময় আখের যে তাজা পাতা পাওয়া যায় গবাদিপশুর জন্য তা সবচেয়ে উপযোগী খাবার। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, আখের পাতা খাওয়ানোর ফলে গবাদি পশুর দুধের পরিমাণ বেড়ে গেছে।


প্রথমত: দেখা যাক অতি দরিদ্র পরিবারের আয় বাড়াতে আখচাষ এর ভূমিকা কী। আমাদের দেশের গ্রাম-শহর সর্বত্রই চিবিয়ে খাওয়ার উপযোগী আখ জাতের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। যে সমস্ত পরিবার দৈনিক মজুরির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে যাদের বসতভিটা ছাড়া আবাদি কোন জমি নেই। পরিবারের কর্তা-ব্যক্তিটি সকালে কাজের সন্ধানে বের হয়ে যায়, কাজের বিনিময়ে পাওয়া মজুরি দিয়ে পরিবারের সবার চাল-ডালের সংস্থান করতেই হিমশিম খায়; তার পক্ষে সন্তানদের জন্য ১টি আখ ২০ টাকা দিয়ে কেনা খুবই কষ্টকর। ওই ব্যক্তিটি যদি তার বসতভিটার আশেপাশে ১০০টি চিবিয়ে খাওয়ার আখের চারা সঠিক সময়ে এবং সঠিক পদ্ধতিতে লাগিয়ে রাখে এবং পরিবারের সদস্যরা সঠিক পরিচর্যা করে তবে রোপণকৃত ১০০টি চারা থেকে কমপক্ষে ৬০০টি সুস্থ সবল আখ পাওয়া সম্ভব, যা সর্বনিম্ন বাজারদরে বিক্রি করে ১২,০০০/- টাকা আয় করা সম্ভব। আর এজন্য যে পরিচর্যা দরকার তা বাড়ির মহিলারাই করতে পারে। অর্থাৎ মাসে ১০০০ টাকা আয় করতে বাড়ির কর্তা ব্যক্তিকে কোন চিন্তা করতে হয় না। অথবা ৬০০টি আখের মধ্যে কিছু আখ বিক্রি করে টাকা আয় করতে পারে এবং অবশিষ্টগুলো শিশুদের খেতে দিলে তাদের পুষ্টি চাহিদা পূরণ হয়।


দ্বিতীয়ত : দেখা যাক অল্প জমির মালিকরাও আখ চাষ করে কিভাবে অনেক বেশি উপার্জন করতে পারে। আজকাল সারাদেশে সারাবছর উপজেলা শহর থেকে গ্রাম-গঞ্জ পর্যন্ত প্রতিটি বাজারের কোনায় কোনায় চিবিয়ে খাওয়া আখ বিক্রি ব্যাপকহারে শুরু হয়। যার বাজারদর এলাকা ভেদে ২০ টাকা থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। দেশের উত্তরাঞ্চলে প্রতিটি আখের দাম অপেক্ষাকৃত কম হলেও মধ্য, দক্ষিণ ও পাহাড়ি অঞ্চলে দাম ও চাহিদা খুবই বেশি। এক বিঘা জমিতে ৩০০০টি চিবিয়ে খাওয়া ইক্ষুর চারা রোপণ করা যায়। (এক্ষেত্রে লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব ১মিটার এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব হবে ৪৫ সে.মি.। এক বিঘা অর্থাৎ ১৩৪৯ বর্গমিটার জমিতে ওই মাপে লাগানো হলে ২৯৯৮ বা ৩০০০টি চারা লাগানো যাবে। সঠিক সময়ে, সঠিক পদ্ধতিতে এটা রোপণ করে, সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে গাছ প্রতি কমপক্ষে ৫টি কুশি পাওয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে ঝাড় প্রতি ১টি মাতৃগাছ এবং ৫টি কুশি অর্থাৎ ৬টি আখ পাওয়া যাবে। সুতরাং ৩০০০টি ঝাড়ে ৩০০০x৬=১৮০০০টি আখ পাওয়া যাবে।) তা থেকে ১৮০০০টি সুস্থ ও সবল আখ উৎপাদন করা সম্ভব। সর্বনিম্ন বাজারদরে (১৮০০০x১০টাকা=১,৮০,০০০ টাকা) তা বিক্রি করেও এ থেকে ১,৮০,০০০/-টাকা আসবে যার চাষাবাদ থেকে বিক্রি পর্যন্ত মোট খরচ হয় প্রায় ২৫০০০ থেকে ৩০০০০ টাকা। অর্থাৎ নিট লাভ হয় ১,৫০,০০০ টাকা। এটা গেল আখের হিসাব। আখ ছাড়াও ওই জমিতে সাথী ফসল চাষ করে প্রায় ১০,০০০-১৫০০০ টাকা নিট লাভ হবে। এ টাকা দিয়ে চাষি তার আখ চাষের ওই খরচ মিটাতে পারবে। যদিও বলা হয় আখ ১২-১৪ মাস মাঠে থাকে কিন্তু এর পরিপক্বতার জন্য ১০-১২ মাসই যথেষ্ঠ। তদুপরি যদি চিবিয়ে খাওয়ার আখ হয় তাহলে তা ৭-৮ মাসেই বিক্রির উপযোগী হয়। এক বিঘার মতো এত অল্প জমি ব্যবহার করে শুধুমাত্র সঠিক জাত ও প্রযুক্তির মাধ্যমে আখ ও সাথী ফসল চাষ করে এত বেশি আয় শুধু আখ চাষের মাধ্যমেই তুলে আনা সম্ভব। সেকারণেই সঠিক জাত ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আখ চাষ করে জমির সুষ্ঠু ব্যবহার করা যেমন সম্ভব তেমনি সম্ভব অধিক উপার্জন এর মাধ্যমে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান করা এবং এভাবেই সম্ভব দেশের দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকার দারিদ্র্য বিমোচনে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা।


তৃতীয়ত : দেখা যাক আখের রস বিক্রেতাদের জীবিকা নিয়ে সারা বছরই দেশের সব উপজেলা শহরের অলি-গলিতে দেখা যায় আখের রস বিক্রেতাদের। এরা ছোট ছোট হস্তচালিত মাড়াই মেশিনে তৎক্ষণিকভাবে আখ মাড়াই করে রস বিক্রি করে। জাতের এবং সময়ের তারতম্য অনুসারে একটি আখ থেকে প্রায় ৬-৮ গ্লাস রস হয়। প্রতি গ্লাস আখের রস স্থান ভেদে ৫-১০ টাকা বিক্রি হয়। অর্থাৎ ওই ব্যক্তি ১০ টাকার আখ থেকে সর্বনিম্ন ৩০ টাকার রস বিক্রি করে আখ প্রতি কমপক্ষে ২০ টাকা লাভ করে। প্রতিদিন এরা মৌসুম ভেদে গড়ে প্রায় ২৫-৫০টি আখ বিক্রি করে ৫০০-১০০০ টাকা নিট লাভ করে। এসব রস বিপণন কাজে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর জন্য অধিক রস উৎপাদন উপযোগী আখ চাষ বৃদ্ধি করতে হবে, সারা বছর আখের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং রস উৎপাদনের মেশিনটিকে একটু সংস্কার করে স্বাস্থ্যসম্মত করতে হবে। তাহলেই সাধারণ জনগণের জন্য আখের রসের চাহিদা পূরণ করা যাবে। পাশাপাশি রস বিপণন কাজে আরো বেশি সংখ্যক লোকের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। এতে একদিকে দারিদ্র্য বিমোচনে যেমন অপরিসীম ভূমিকা পালন করবে, তেমনি পুষ্টি উপাদানের জোগানও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।


চতুর্থত : দেখা যাক বড় চাষিরা আখ চাষের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে কি ভূমিকা পালন করতে পারে। বড় চাষিদের দায়িত্বও বড়। তারা যদি বাণিজ্যিকভাবে আখ ও সাথী ফসল চাষ করে তা চিনিকলে দেয়ার জন্য, গুড় তৈরির জন্য কিংবা চিবিয়ে খাওয়ার জন্য যে কারণেই করুক না কেন, আখ যেহেতু সারা বছরব্যাপী মাঠে থাকে তাই শ্রমিকের কর্মসংস্থানও সারাবছরব্যাপী করতে পারে। তাছাড়া আখ পরিবহনে, গুড় তৈরিতে, এবং গুড় বাজারজাতকরণে যে পরিমাণ মানুষের কর্মসংস্থান হয়, অন্য কোন একক ফসলে এত কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ নেই। কেউ হয়তো ভাবতে পারেন এত মানুষের কর্মসংস্থান করার পর গুড় তৈরি করে তা কি লাভ হবে? অবশ্যই হবে। কারণ বাজারে চিনির চেয়ে গুড়ের দাম বেশি। আর যদি ভেজালমুক্ত গুড় তৈরির প্রমাণ করতে পারেন এবং সেই গুড়ের একটা ব্র্যান্ড/ট্রেড মার্ক তৈরি করতে পারেন তবে তার সে ব্যবসাটি হবে দীর্ঘস্থায়ী এবং অধিক লাভজনক।


পঞ্চমত : দেখা যাক আখ চাষের মাধ্যমে বড় কোন উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়টি। অনেক দেশের মতোই বাংলাদেশেও এখন আখের রস বোতলজাত করে বাজারজাত করার প্রযুক্তি রয়েছে। আখের রসের ভেষজ গুণ, পুষ্টিমান এবং স্বাদের কারণে এর চাহিদা এবং জনপ্রিয়তা যে কোন কোমল পানীয়ের চেয়ে অনেক বেশি। অতএব অল্পকিছু বিনিয়োগের করে আখের রস বোতলজাত করার মাধ্যমেও একটি উন্নতমানের ব্যবসা শুরু করা যেতে পারে। এক্ষেত্রেও অনেক কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে। এমনকি তা রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেরও সুযোগ রয়েছে। এসব ছাড়াও আখ থেকে বায়োফুয়েলসহ আরো অনেক শিল্প স্থাপনেরও যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

এসব কারণেই দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ভিত্তিক আখ চাষ করা জরুরি প্রয়োজন। আখ চাষে জমির মালিকের লাভের পাশাপাশি অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়। যদিও চিনিকল এলাকার আখচাষিরা আখ সরবরাহ করে সময়মতো আখের দাম না পাওয়াতে হতাশায় ভোগেন, তবে দেরিতে হলেও সেখানে আখের মূল্যটি কিন্তু নির্দিষ্ট থাকে। অন্য ফসলের মতো ওঠানামা করে না। আর চিনিকলবহির্ভূত গুড় উৎপাদন এলাকায় আখ চাষিরা অপেক্ষাকৃত বেশি দামে আখ বিক্রি করে থাকেন। অন্যদিকে চিবিয়ে খাওয়া আখ উৎপাদনকারীগণ লাভ করেন সবচেয়ে বেশি। ফলে শেষোক্ত দুই এলাকার আখ চাষিদের আখ চাষে কোনো হতাশা নেই। তাই সারা দেশের সকল ধরনের জমিতেই আখের আবাদ বিস্তৃত করা যেতে পারে। বিশেষ করে চাষের জন্য প্রতিকূল জমি এবং দুযোগপূর্ণ আবহাওয়ায় একমাত্র আখই নিশ্চিতভাবে চাষিকে ফসলহানির আশংকা থেকে মুক্ত রাখে। এখানে তারই কয়েকটি উদাহরণ দেয়া হলো।


খরাপীড়িত এলাকা
দেশের উত্তরাঞ্চলের খরাপীড়িত এলাকার কথা বলি। আখ ফসল সবচেয়ে বেশি খরায় টিকে থাকতে পারে। শুধু তাই নয় যেখানে অন্য সব ফসল পানির অভাবে মারা যায় সেখানেও আখ ফসল বেঁচে থাকতে পারে এবং পানি পেলে তা আবার পত্র-পল্লবে সুশোভিত হয়ে ওঠে। সেজন্যই উত্তরাঞ্চলের খরাপীড়িত এলাকায় আখ চাষের ব্যাপকতা বেশি। শুধু আখই নয়, খরাপীড়িত এলাকার জন্যও আখের সাথে সাথী ফসল চাষের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে।


চরাঞ্চলের বালিময় পতিত জমি
চরের বালিময় পতিত জমিতে যেখানে অন্য কোন ফসল চাষ করে লাভ করা যায় না, সেখানেও আখ চাষ করে, আখের সাথে সাথী ফসল করে এবং গুড় তৈরি করে যথেষ্ট লাভ করার সুযোগ রয়েছে। এর কারণ আখের শিকড় অনেক দূর পর্যন্ত গভীরে চলে যেতে পারে। তাছাড়া চরে অন্যান্য ফসল চাষ করে চাষিরা ঝুঁকিতে থাকেন। কারণ বন্যায় তা ডুবিয়ে নিয়ে যেতে পারে। অথচ আখ এমন একটি ফসল যা ১২-১৫ ফুট লম্বা হয় এবং বন্যায় এর নিম্নাংশ ডুবে থাকলেও কোন ক্ষতি হয় না। আবার চরে যেসব স্বল্পমেয়াদি ফসল হয় সেগুলোকে সাথী ফসল হিসেবে আখের সাথে চাষ করা যায়। ফলে আখ থেকে গুড় তৈরি করে মূল লাভের পাশাপাশি আরো বেশি লাভ করা সম্ভব হয়।


দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত এলাকা
যেখানে লবণাক্ততার কারণে অন্য কোন ফসল উৎপাদন করা যায় না সেখানেও আখ ফসল তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে। আরো নির্দিষ্ট করে বলা যায় উচ্চমাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করার মতো প্রচলিত ফসলধারায় অন্য কোন ফসল নেই। সম্প্রতি অবমুক্ত কেবলমাত্র দুটি ধানের জাত (বিনা ধান ১০ প্রতি মিটারে ১২ ডিএস এবং ব্রি ধান ৬৭ প্রতি মিটারে ৮ ডিএস) ওই মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। কিন্তু আখ ফসল তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়েই প্রতি মিটারে ১৫ ডিএস মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। তাই লবণাক্ত এলাকারও লাভজনক ফসল আখ।


পাহাড়ি এলাকা
পাহাড়ি এলাকায়ও এক বিঘা জমিতে ৩০০০টি চিবিয়ে খাওয়া আখের চারা সঠিক সময়ে, সঠিক পদ্ধতিতে রোপণ করে তাহলে সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে তাথেকে ১৮০০০টি সুস্থ ও সবল আখ উৎপাদন করা সম্ভব। পাহাড়ি এলাকায় আখের বাজার দর অপেক্ষাকৃত বেশি। ফলে সর্বনিম্ন বাজারদরে তা বিক্রি করেও ৩,০০,০০০/- টাকা উপার্জন করা সম্ভব। অল্প জমি ব্যবহার করে সঠিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আখ ও সাথী ফসল চাষ করে এত বেশি আয় করা শুধু আখ চাষের মাধ্যমেই সম্ভব। একইভাবে পাহাড়ি এলাকায় গুড়ের দামও বেশি। তাই ওখানকার মানুষ গুড় করেও বেশি লাভ করতে পারেন।


পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকা
হাওড় এলাকার অনেক জায়গাই রয়েছে যেখানে অল্প কিছুদিন পরেই পানি নেমে যায়। এসব জায়গাগুলো নির্বাচন করে সেখানে জলাবদ্ধতা সহিষ্ণু আখের জাত রোপণ করা যেতে পারে। যেমন- ঈশ্বরদী ৩৭, ঈশ্বরদী ৩৪, ঈশ্বরদী ২০, ঈশ্বরদী ২১ প্রভৃতি।


দুযোর্গ এর ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকা
সমুদ্র তীরবর্তী উপকূলীয় এলাকা যেখানে প্রায় প্রতি বছরই সিডর-আইলার মতো মারাত্মক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় হানা দিয়ে ক্ষেতের সব ফসল লণ্ডভণ্ড করে দেয়, সেখানে আখফসল থাকলে তা ওই এলাকার জীবনরক্ষাকারী ফসলে পরিণত হয়। কারণ ঘূর্ণিঝড়ে লণ্ডভণ্ড সবকিছুতে রান্না করার উপকরণও চলে যায়, ঘরের শুকনা খাবারও (যদি থাকে) শেষ হয়ে যায়, আর সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় পানীয় জলের। অন্যদিকে ঢাকা তথা দেশের দূর-দূরান্ত থেকে পানীয় জল কিংবা খাদ্য সাহায্য পৌঁছাতেও সময় লাগে। আর এ সময়েই পানির অভাবে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় ওই এলাকার শিশুরা, এমনকি তাদের জীবনহানিরও আশংকা দেখা দেয়। অথচ ওই এলাকায় বাড়িতে বাড়িতে চিবিয়ে খাওয়া আখ থাকলে, ঝড়ে তা যত ক্ষতিগ্রস্তই হোক না কেন, তা থেকে পানি ও পুষ্টি উভয়ই পাওয়া যেতে পারে। সংকটকালীন ওই সময়ে বাড়ির শিশুদের জন্য তা হয় জীবনরক্ষাকারী খাদ্য। সেকারণেই সমুদ্র তীরবর্তী উপকূলীয় এলাকার প্রতিটি বাড়িতেই চিবিয়ে খাওয়া আখের আবাদ করতে হবে।


অর্থাৎ সারাদেশেই আখ চাষ করা এখন জরুরি প্রয়োজন। বরং উল্টা করে বলা যায় আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে যখন বিজ্ঞানীরা খুঁজে বেড়াচ্ছেন পরিবর্তন সহিষ্ণু ফসল, সেখানে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সহিষ্ণু ফসল হচ্ছে আখ। আখের রস যেমন পুষ্টিকর, আখের চাষও তেমনি লাভজনক। এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় হচ্ছে এলাকাভিত্তিক আখের জাত নির্বাচন করে তার ভালো বীজের সরবরাহ বৃদ্ধি করা। এটা করতে পারলেই আখ চাষ সম্প্রসারণ করা অনেক সহজ হবে, কারণ আখ সম্প্রসারণের প্রধান অন্তরায় হচ্ছে ভালো বীজের অভাব। একটা কথা মনে রাখতে হবে যে আখ চাষের উপকরণ, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি জ্ঞান এবং উৎপাদিত কাঁচামালের বাজার সবই আমাদের দেশেই যথেষ্ট ভালো রয়েছে। তাই দেশের যে কোন এলাকায় আখচাষে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা তেমন কোন কঠিন কাজ নয়। আর এটা করতে পারলেই দেশের চিনি ও গুড় এর জোগান নিশ্চিত করার পাশাপাশি অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের দারিদ্র্য বিমোচনেও যথেষ্ঠ ভূমিকা রাখা সম্ভব।

ড. সমজিৎ কুমার পাল*
* মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালক, বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঈশ্বরদী-৬৬২০, পাবনা


Share with :

Facebook Facebook