কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

উদ্যান ফসলের পরিপক্বতার নিয়ামক ও ফসল সংগ্রহ

ফল সবজির দৈহিক বর্ধন তার যোজনা হতে পূর্ণ বৃদ্ধি হতে স্বাভাবিক নিয়মে কয়েক সপ্তাহ সময় নিয়ে থাকে। আর ফল সবজির সর্বোচ্চ দৈহিক বর্ধন পর্যায়ে পৌঁছার পরপরই পরিপক্বতা শুরু হয় এবং পরিপক্বতা কতগুলো বৈশিষ্ট্যদ্বারা নির্ধারিত হয়। তবে পরিপক্বতা কিছু কিছু প্রভাবক দ্বারা আগাম বা বিলম্বিত হতে পারে। যেমন- পরিবেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা কমে যাওয়া, হরমোন বা রাসায়নিক পদার্থ স্প্রে/ প্রয়োগ করা, একটানা শুষ্ক বাতাস প্রবাহিত হওয়া প্রভৃতি।
 
পরিপক্বতা হচ্ছে ফসলকে তোলার একটি বিশেষ মুহূর্ত বা অবস্থার নিয়ামক। ফসল সংগ্রহের এই বিশেষ অবস্থাটি ফসলের গুরুত্বপূর্ণ গুণাগুণ সংরক্ষণ করে। সঠিক পরিপক্বতায় ফসল সংগ্রহ করলে ফসলের মান ভালো পাওয়া যায়। ফল সঠিক পরিপক্বতার আগে সংগ্রহ করলে ভালোভাবে পাকবে না এবং সুবাসিত হবে না অপর পক্ষে সঠিক পরিপক্বতার পরে সংগ্রহ করলে ফলের জীবনকাল কমে যাবে এবং তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যাবে। একইভাবে শাকসবজি সময়ের আগে সংগ্রহ করলে অনেক সময় ধরে সবুজ থাকবে কিন্তু পণ্য হবে নিম্নমানের। আবার দেরিতে সংগ্রহ করলে নষ্ট হওয়ার সময় কমে যাবে এবং মান ও বাজারমূল্য কমে যাবে। ফল ও শাকসবজি সঠিক পরিপক্বতায় সংগ্রহ করলে উন্নত গঠন, ভালোস্বাদ, গন্ধ, সঠিক ওজন ও দর্শনীয় রঙ হয়।
 
পরিপক্বতার প্রকার
পরিপক্বতা দুই প্রকার
স্বাভাবিক পরিপক্বতা (Physiological Maturity): ফল ধরার পর বাড়বাড়তির শেষ অবস্থার দৈহিক কিছু পরিবর্তন (রঙ ত্বকের মসৃণতা, উজ্জ্বলতা, শুষ্কতা হওয়াকে স্বাভাবিক পরিপক্বতা বলে। ফল নিয়মতান্ত্রিকভাবেই এ স্বাভাবিক পাকার ক্ষমতা অর্জন করে। এ সময় সহজে দৃশ্যমান ফলের বাইরের এবং শরীরবৃত্তীয় ভেতরের এমন অবস্থা হবে যাতে স্বাভাবিকভাবে ফল পেকে যায়।
 
ব্যবসায়িক বা উদ্যানতান্ত্রিক পরিপক্বতা (Commercial or Horticuitural Maturity) : ভোক্তা বা বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের বাড়বাড়তির যে কোনো অবস্থাকে ব্যবসায়িক বা উদ্যানতান্ত্রিক পরিপক্বতা বলে। যেমন পেঁপের সর্বোচ্চ বাড়বাড়তির সবুজ অবস্থাকে সবজি হিসেবে ব্যবহারের জন্য উপযোগী আবার পাকা ফল হিসেবে খেতে চাইলে ফলের একটু হলুদ রঙ ধারণ করলেই খাওয়ার উপযোগী হয়। ব্যবসায়িক পরিপক্বতায় অনেকসময় সামষ্টিক উৎপাদনের পরিমাণ কমে যায়।
 
পরিপক্বতার নিয়ামক
পরিপক্বতার নিয়মক হচ্ছে কতকগুলো চিহ্ন বা নির্দেশনা যাহা ফসল সংগ্রহের সময়কে (অবস্থা) বোঝায়। এটি ফসল সংগ্রহের তারিখ নির্ধারণ করে।
 
ভালো নিয়ামকের বিষয়সমূহ : ফসল সংগ্রহের ভালো নিয়ামক গুণ হচ্ছে যার দ্বারা সহজেই নির্ভরশীলতার সাথে পরিপক্ব হয়েছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায় এবং তা সময় এবং অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল নয়।

নিয়ামকের প্রকারভেদ
সাধারণ জ্ঞানের ব্যবহার যেমন চোখে দেখে হতে পারে বা হাতে নিয়ে নির্ধারণ করা যায়। যেমন-
(ক) দেখে নির্ণয়- সাইজ, রঙ কাঠামো ইত্যাদি।
(খ) অনুভব করে-গন্ধ (সুবাস), ছুয়ে (খসখসে, মসৃণ, নরম, শক্ত), স্বাদ (মিষ্টি, টক, ঝাঝালো, লবণাক্ত, তিতা), শুনে (আংগুল দিয়ে বাজিয়ে শব্দ শুনে)।
(২) মেপে নির্ণয় করা। এটা একটি জটিল বিষয় এবং সময়ক্ষেপণ হয়, কখন ফসলটি সংগ্রহ করা হবে তা সহজে নির্ণয় করা যায় না।
(ক) সময়- ফুল থেকে সংগ্রহ পর্যন্ত  যোজনা হতে পূর্ণবৃদ্ধি হওয় পর্যন্ত)
(খ) পারিপাশ্বিক আবহাওয়া- ফসল বাড়বাড়তির সময়ের তাপমাত্রা, বাতাসের শুষ্কতা ও প্রবাহতা।
(গ) রাসায়নিক দ্রবাদির পরিমাপ-টিএএস, চিনি ও এসিডের অনুপাত।
(ঘ) জৈব-রাসায়নিক বিষয়- শ্বসনের হার ও ইথিলিন উৎপাদনের পরিমাণ নির্ণয়।

প্রধান কয়েকটি ফলের পরিপক্বতার নিয়ামক
ফলের নাম
আম : আমের কাঁধে (বোঁটার কাছে) যখন হালকা রঙ হয় (২) ২/১টি স্বাভাবিক পাকা আম গাছ থেকে মাটিতে পড়ে (৩) ফলের স্পেসিফিক গ্রাভিটি যখন ১.০১ ও ১.০২ হয় (৪) জাত ও আবহাওয়ার অবস্থাভেদে ফল পরিপক্ব হতে একটা নির্দিষ্ট সময় যেমন এক পরীক্ষায় দেখা গেছে ফল ধারণের ৮২, ৮৬, ৯৯ ও ১১৪ দিন পর গোপালভোগ খিরসাপাতি, ল্যাংড়া এবং ফজলি জাতের আম পরিপক্ব হয়।
 
কাঁঠাল : ফল পরিপক্ব হলে ফলের উপরের কাটাগুলো মোটা, চ্যাপটা ও উপরের অংশ কালচে হবে। হাতের আংগুল দিয়ে চাপ দিয়ে পরিপক্ব কি না বোঝা যায়। গাছে একটি ফল পাকা পাওয়া গেলে কাঠি দিয়ে আঘাত করলে ড্যাব ড্যাব শব্দ হলে পরিপক্ব হয়েছে বোঝা যায়। পাকার মিষ্টি গন্ধ পাওয়া যায়। সাধারণত ফল ধরার ১২০-১৫০ দিনের মধ্যে কাঁঠাল পরিপক্ব হয়। তরকারির জন্য কাঁঠালের বিচি শক্ত হলে সংগ্রহ করা যায়।
 
পেঁপে: ফলের গায়ে সামান হলুদ রঙ হলে। ফলের দুধ পাতলা হয়ে পানির মতো হলে।
 
কলা: ফলের শির যখন কনিক্যাল থেকে গোলাকার হয়ে এবং হালকা ক্রিম রঙ হলে। আবহাওয়া ও জাতভেদে পুষ্প মঞ্জুরি বের হওয়ার ৯০-১১০ দিন পর কলা সংগ্রহের উপযোগী হয়। (শীতকালে ১১০ দিন এবং গ্রীষ্মকালে ৯০ দিন)।
 
লিচু : ফল সম্পূর্ণ লাল রঙ হলে, ফলের কাটাগুলো মোটা ও কাটার গোড়া ছড়ায়ে গেলে এবং মিষ্টতা এলেই সংগ্রহের উপযুক্ত হয়। সাধারণত ফল আসার ৫৫-৬৫ দিন পর (জাত ও আবহাওয়ার তারতম্য অনুযায়ী) ফল সংগ্রহের উপযুক্ত হয়।
 
পেয়ারা : সবুজাভ ক্রিম/ ঘিয়া রঙ হলে, ত্বক পাতলা উজ্জ্বল হয়।
 
কুল : ফল আসার ৪-৫ মাস (জাত ওয়ারী) পর ফল সংগ্রহের উপযুক্ত হয়। ফল নরম এবং রঙ সবুজাভ হলুদ বা সোনালি হলুদ রঙ হলেই সংগ্রহ করতে হয়।  
 
আনারস : স্থানীয় বাজারের জন্য ফল সম্পূর্ণ পাকলেই সংগ্রহ করা হয়। বিদেশে রফতানির জন্য সবুজ অবস্থায় বা হালকা লালচে বা হলুদাভ রঙ হলে সংগ্রহ করা হয়। পরিপক্ব জায়েন্টকিউ জাতে নিচের চোখগুলো কমলা থেকে হলুদাভ কমলা রঙ হয় এবং চোখগুলো মাঝখানে চ্যাপ্টা ও পার্শে মোটা হয়। হানিকুইন জাত সংগ্রহ করা হয়- এম১: ফলের গোড়ার দিক হলুদ হলে এম২: ফলের অর্ধেক পর্যন্ত রঙিন হলে অর্থাৎ ফলের শতকরা ১৫-৫০ ভাগ হলুদ রঙ হলে এবং এম৩: ফল যখন অর্ধেকের বেশি রঙিন হয় অর্থাৎ শতকরা ৫০ ভাগের বেশি হলুদ হলে। স্থানীয় বাজারের জন্য এম২: অবস্থায় এবং দূরবর্তী রফতানির জন্য বাজারের জন্য গ্রাহকের চাহিদার ভিত্তিতে সাধারণত এম১ এবং এম২ অবস্থায় ফল সংগ্রহ করা হয়।
 
নারিকেল : নারিকেল সাধারণত ফুল আসার ১২-১৩ মাস পর পরিপক্ব হয়। যখন নারিকেলের খোসা খড়ের মতো রঙ ধারণ করে (ঝুনা নারিকেল), তখন সম্পূর্ণ পরিপক্ব হয়। পরিপক্ব নারিকেলে অল্প পরিমাণে পানি থাকে, যা ঝাকানি দিলে বোঝা যায়। পানির জন্য ৫-৬ মাস বয়সের ফল সংগ্রহ করা যায়।
 
লেবু : লেবু জাতীয় ফল সাধারণ পরিপূর্ণ বাড়বাড়তি হলে এবং ত্বকের রঙ উজ্জ্বল বা চকচকে সবুজ অবস্থায় সংগ্রহ করতে হয়।
 
তরমুজ : বাড়ি দিলে ড্যাব ড্যাব  বা ফাপা শব্দ হবে, পাতা শুকিয়ে যাবে এবং সবুজাভ মাখন রঙ হলে এবং আঁকড়া শুকিয়ে গেলে।
 
শাকসবজির পরিপক্বতার নিয়মক
শাকসবজির নাম
বাঁধাকপি : বাঁধাকপির বল যখন শক্ত বা দৃঢ় হবে এর ভেতরের কোনো জায়গা ফাঁকা থাকবে না। বাঁধাকপির উপরে চাপ দিলেই বোঝা যাবে সংগ্রহের উপযুক্ত হয়েছে কি? না।
 
ফুলকপি : ফুল শক্ত হলে এবং সাদা মাখন রঙ হলে, ফুলগুলো আঁটসাঁট এবং দৃঢ় হলে।
 
আলু : পাতা স্বাভাবিকভাবে শুকিয়ে গেলে এবং আলুর চামড়া সহজে ছাড়ান না গেলে।

টমেটো : নিকটবর্তী বাজারের জন্য ত্বকের/ গায়ের রঙ সামান্য হলুদাভ হলে এবং দূরবর্তী বাজারের জন্য গা টান টান অবস্থায় মাখন সবুজ রঙ হলে সংগ্রহ করতে হবে।

পেঁয়াজ : গাছ শুকয়ে যাবে ও ৫০-৭৫% পাতা নেতিয়ে পড়ে যাবে এবং ঘাড় ছোট হলে। কন্দের গলার কোষ/ কলা নরম হলে। সাধারণত লাগানোর ৯০-১০০ দিন পর সংগ্রহের উপযুক্ত হয়।

রসুন : গাছের পাতা যখন হলুদ ও পরে বাদামি রঙ হবে, পাতা ভেঙে পড়বে এবং বাহু যখন আর বাড়বে না তখন সংগ্রহরে উপযুক্ত সময়।
 
বেগুন: জাত অনুযায়ী নির্দিষ্ট আকার ধারণ করলে এবং শক্ত হওয়ার আগেই সংগ্রহ করতে হবে। চামড়া উজ্জ্বল এবং চকচকে ভাব থাকবে। বেশি পরিপক্ব বেগুন এর রঙ খারাপ হবে, শাঁস এবং বীজ শক্ত হবে।
 
ঢেঁড়স: কচি অবস্থায় সর্বোচ্চ বাড়বাড়তির সময় আগায় চাপ দিলে সহজেই ভেঙ্গে গেলে খাওয়ার উপযুক্ত থাকে।

মরিচ : কাঁচা মরিচের জন্য রঙ ধারণের আগে সর্বোচ্চ বড় হলে এবং শুকনা করার জন্য মরিচ সম্পূর্ণ লাল রঙ হলে।
 
পটোল : সম্পূর্ণ পরিপক্ব হওয়ার আগেই পটোল সংগ্রহ করতে হবে। ফলকে চাপ দিলে ভরাট মনে হবে।

শসা : হলুদ রঙ শুরু হওয়ার আগেই গায়ে লোমশ থাকা অবস্থায় ফল সংগ্রহ করতে হবে।

ফ্রেঞ্চবিন : বীজ বপনের ৪৫-৬০ দিন পর বা ফুল আসার ১৫ দিন পর সংগ্রহ করতে হবে।

ফসল সংগ্রহ
ফসল সংগ্রহ হচ্ছে পণ্যকে গাছ থেকে নিয়মানুযায়ী উদ্দেশ্যভিত্তিক তোলা। ফল ও শাকসবজির মান

সংরক্ষণের জন্য ফসল
সংগ্রহ ও স্থানান্তরের সময় যত নেয়া জরুরি নিয়ম অনুযায়ী ফসল সংগ্রহ ও স্থানান্তর না করলে পণ্যের মান ও বাজারমূল্য কমে যায়। পণ্য ঘষা খেলে বা ক্ষত হলে বা থেতলে গেলে বাদামি ও কাল দাগ হয়ে উজ্জ্বলতা হারায়। ক্ষত হলে বিনষ্টকারী জীবাণু অনুপ্রবেশের সুবিধা হয়, যা পণ্যকে পচাতে ত্বরান্বিত করে। এসব কারণে পণ্যের শ্বসনের হার বেশি বেড়ে যায় এবং সংরক্ষণের সময়কাল কমে যায়। ফসল সংগ্রহ ও হস্তান্তর বিষয়ে সঠিক জ্ঞান না থাকলে ফল ও শাকসবজির যথেষ্ট ক্ষতি হয়।
 
ফসল সংগ্রহের সময়
ফসল সংগ্রহের সময় ( মৌসুমের আগে বা দেরিতে) নির্ভর করে অনেক বিষয়ের ওপর যেমন- ফসলের বাজারমূল্য আবহাওয়ার পূর্বাভাস বা পরিবর্তন, পণ্যের ধরন (ক্লাইম্যাকটেরিক বা নন-ক্লাইম্যাকটেরিক), ভোক্তার চাহিদা, ব্যবহারের পদ্ধতি এবং বাজারের দূরত্ব অনুযায়ী। এর পরও এটা নির্ভর করবে ফসলের পরিপক্বতা, সর্বনিম্ন পুষ্টিগত মান এবং ভোক্তার চাহিদা অনুযায়ী।
 
ফসল সংগ্রহের পদ্ধতি
হাতের সাহায্যে সংগ্রহ : বেশিরভাগ উদ্যানতান্ত্রিক ফসল টাটকা খাওয়া ও বাজারজাত করার জন্য হাত দিয়ে সংগ্রহ করা হয়। হাত দিয়ে সংগ্রহ করলে পণ্যের ক্ষতি অনেক কম হয়। এর পরও এ পদ্ধতি ব্যয় বহুল ও ধীরগতিসম্পন্ন এবং অনেক সময় শ্রমিকের অভাব হয়। হাত দ্বারা নির্দিষ্ট পণ্যকে চাহিদা মোতাবেক অনেকবার তোলা যায়।
 
সহায়ক সংগ্রহ : এই পদ্ধতিতে অনেক যন্ত্রপাতির ব্যবহার হয় যেমন-চাকু ও ফসল তোলার যন্ত্র। সাধারণ যন্ত্রপাতির মধ্যে মই, ফসল তোলার ঝুড়ি, ফল পাড়ার লম্বা বাঁশ, মোটরচালিত ফসল সংগ্রহের প্লাটফর্ম ইত্যাদির ব্যবহার হয়।
 
মেকানিক্যাল সংগ্রহ : উন্নত বিশ্বে মেকানিক্যাল পদ্ধতিতে ফসল সংগ্রহ করা হয় সাধারণত টিনজাত, হিমায়িতকরণ, শুকান ও জুস তৈরিতে ব্যবহারের জন্য।
 
এই পদ্ধতিতে ফসল সংগ্রহ করলে সাধারণ ক্ষতি হয় এবং তাড়াতাড়ি পচে যায় ও খচর বেশি হয়। মেকানিক্যাল পদ্ধতি একবারে ফসল তোলা হয় এর ফলে সংগৃহীত ফসলের মধ্যে সমতা থাকে না (পাকা, সাইজ, রঙ ইত্যাদি)
 
ফল ও সবজির সংগ্রহ পদ্ধতি
ফল ও শাকসবজির গঠনগত পার্থক্যের কারণে সংগ্রহের পদ্ধতির তারতম্য হয়। আবার বিভিন্ন ধরনের ফল ও শাকসবজি সংগ্রহের পদ্ধতি ভিন্ন ভিন্ন। তথাপিও কিছু ফল ও শাকসবজির সংগ্রহ পদ্ধতি নিম্নে বর্ণনা করা হলো।
 
(১) কলা : কলার কাণ্ডটিকে এমনভাবে কাটতে হবে, যাতে কলার কাঁদিটি মাটিতে না স্পর্শ করে বরং ঝুলে যায়। এরপর কলার সর্বশেষ ছড়া হতে কাঁদিটি ৩০ সেমি. রেখে কেটে নিতে হবে, যাতে সহজেই হাতে বহন করা যায়।
 
(২) কাঁঠাল : ফল যদি হাতের নাগালের মধ্যে হয় তাহলে বোঁটাটি চাকু দিয়ে বা মোচড়াইয়া পাছ থেকে আলাদা হলে নামানো হয়। যদি গাছটি লম্বা হয় তাহলে ফলটিকে একটি বস্তা বা দড়ি দিয়ে বেধে বোঁটা কেটে ধীরে ধীরে মাটিতে নামানো হয়।
 
(৩) লিচু : ফলে থোকাগুলো পাতা ও ডালের কিছু অংশসহ কেটে নিতে হয়। আলাদা করে একটি করে লিচু সংগ্রহ করা যায় না, কারণ এত ফল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সহজেই পচন ধরে এবং বাজারমূল্য কমে যায়।
 
(৪) আম : যত বেশি সম্ভব আম হাত দিয়ে গাছ থেকে পাড়া। বড় গাছের জন্য বাঁশের লম্বা পোল ব্যবহার করা হয় যার আগায় একটি দড়ির ঝুড়ি লাগানো থাকে (চাঁপাইনবাবগঞ্জে ঠুসি বলে)। অনেক সময় বড় গাছে আম সংগ্রহকারীরা গাছে উঠে আম পেড়ে দড়ির ঝুড়িতে ভরে মোটা লম্বা রশিতে বেঁধে নিচে নামায়। যার ফলে আমে কোন ঘষা লাগে না এবং ক্ষত হয় না।
 
(৫) পেঁপে : পেঁপে সাধারণত টান দিয়ে বা মোচড়াইয়া গাছ থেকে আলাদা করে সংগ্রহ করা হয়। ল¤া^ গাছের জন্য সাধারণত মই ব্যবহার করা হয়। লম্বা পোল ব্যবহার করে ফল সংগ্রহ করলে ফল ক্ষত হয়ে যায়, যার ফলে সহজেই পচন ধরে।
 
(৬) আনারস : আনারস উত্তোলনকারী হাতে গোবস লাগিয়ে ফলটির মুকুট ধরে নিচে চাপ দিয়ে বা একটি ধারাল চাকু দিয়ে আধা সেমি. ফলের সংগে কান্ড রেখে কেটে নিতে হয়।
 
(৭) মুলা ও গাজর : মুলা ও গাজর তোলার উপযুক্ত হলে সম্পূর্ণ গাছকে মাটি থেকে তুলে নিতে হয়। এগুলো পাতাসহ বা পাতা ছাড়া বাজারজাত করা যায়।
 
(৮) আলু : আলু সংগ্রহের সময় ক্ষতি কমানোর জন্য আলুর ভেতরের রস কমাতে হয়। আলু সংগ্রহের এক সপ্তাহ আগে আলু গাছগুলো কেটে দিতে হয়। এর পর কোদাল বা ছোট লাঙল দিয়ে আলু মাটির উপরে উঠিয়ে আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে ১৫ থেকে ৬০ মিনিট রেখে দিতে হয়।
 
(৯) বাঁধাকপি : একটি বড় চাকু দিয়ে বাঁধাকপিটিকে গোড়া থেকে পুরাতন পাতা ২-৩টি রেখে কেটে আলাদা করতে হয়। তবে কোন কোন সময় সম্পূর্ণ গাছই টান দিয়ে উঠানো হয়।
 
(১০) ফুলকপি : নিচের দিকে কিছু পাতা রেখে চাকু দ্বারা সাবধানে নিচের কাণ্ডটি কেটে সংগ্রহ করতে হয়। ফুল যেনক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য ফুলের উপরে পাতা জড়াইয়া দিতে হয়।
 
(১১) ব্রোকলি : বড় পাতাগুলো সরায়ে দিতে হবে এবং ফুলের ২০-২৫ সেমি. নিচে চাকু দ্বারা কেটে সংগ্রহ করতে হবে।
 
(১২) শিম : শিম কৃষকেরা হাতের সাহায্যে উত্তোলন করেন।
 
(১৩) শসা : ফলগুলো গাছের লতা থেকে আলাদা করা হয় বা উত্তম হলো বোঁটাকে চাকু দিয়ে কেটে আলাদা করা, কোন অবস্থায় ফলের গায়ে হাত না দেয়া।
 
(১৪) বেগুন : ফলকে ধারাল চাকু দিয়ে বোঁটার গোড়া থেকে কেটে সংগ্রহ করতে হবে।

(১৫) ঢেঁড়স :  ঢেঁড়স সংগ্রহের সময় গোবস বা কাপড় পরতে হবে, যাতে ধারাল শুংগুলো শরীরে ক্ষতি না হয়।
বোঁটাগুলো ধারাল চাকু দিয়ে কেটে আলাদা করে প্লাস্টিকের ঝুড়িতে রাখতে হয়, যেন কোনো ক্ষতের সৃষ্টি না হয়।

(১৬) টমেটো : ফল ধরে অর্ধ মোচড়াইয়া বা সম্পূর্ণ মোচড়াইয়া ফল সংগ্রহ করতে হয়। যখন টমেটো পরিপক্ব হয় তখন সহজেই গাছ থেকে আলাদা করা যায়।
 
(১৭) তরমুজ : বোঁটার কিছু অংশ রেখে ফলটিকে কেটে সংগ্রহ করতে হয়।

ফসল সংগ্রহের সময় করণীয়

ক) মেকানিক্যাল ক্ষত কম করা :
১) সনাতন পদ্ধতিতে না ভাঙা পর্যন্ত টানা, মোচড়ানো, ঝাঁকানো, বাঁকানোর পরিবর্তে ক্লিপারের সাহায্যে ফসল সংগ্রহ করা উত্তম।
২) লম্বা বাঁশের পরিবর্তে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো ঠুসি ব্যবহার করা উচিত।
৩) প্রয়োজনবোধে হাতে গ্লোবস ব্যবহার করা যদি ফসলটি ধারাল কাটা যুক্ত হয়।
৪) পরিবহন পাত্র শক্ত, অমসৃণ বা তীক্ষè হলে তা পরিহার করা উচিত।
৫) পরিবহনে যেন ঝাঁকি না লাগে তা বিবেচনায় আনতে হবে।

খ) অধিক তাপ পরিহার করা :
১) মাঠের তাপ কমানোর জন্য দিনের ঠাণ্ডা সময়ে (খুব সকালে বা দেরিতে) ফসল সংগ্রহ করা উচিত।
২) সংগৃহীত ফসল পরিবহন, প্যাকিং হাউজ বা শীতলীকরণ হাউজে না নেয়া পর্যন্ত ছায়াযুক্ত স্থানে সংরক্ষণ করা।
গ) মাটির সংস্পর্শে কম যায় সেদিকে খেয়াল রাখা।
ঘ) আম এবং কলাকে আঁঠাল ক্ষতি থেকে রক্ষা করা।
ঙ) কম খরচ এবং সহজ পদ্ধতি অনুসরণ করা।
 

ড. মো. ইত্তেফাকুল আজাদ*
* সাবেক উপপরিচালক, ডিএই, ৪৯১/পদ্মা আবাসিক এলাকা, রোড নং-১০, রাজশাহী। মোবাইল : ০১৭১৫১৭১০৫০
 

Share with :

Facebook Facebook