কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির চলমান উদ্যোগ

ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির চলমান উদ্যোগ বনাম ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা
পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মানুষের প্রধান খাদ্য ‘ভাত’। বিশ্ব বাজারে চালের দামও অন্য সব শর্করা সমৃদ্ধ খাদ্য পণ্যের চেয়ে অনেক বেশি। বিশ্বের চাল রপ্তানিকারক যে কোনো দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত কারণে চালের উৎপাদন কমে গেলে বিশ্ববাজারেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, চালের দাম যায় আশংকাজনক হারে বেড়ে। কাজেই চাল আমদানিকারক দেশের পক্ষে চাহিদা মাফিক চাল আমদানি অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। প্রয়োজনের সময় অতি উচ্চমূল্যে চাল কিনে বাংলাদেশের মতো ভাত খেকো বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্যের চাহিদা মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়বে এটাই স্বাভাবিক। কখনও কখনও এমন পরিস্থিতিরও উদ্ভব হয় যে অতি উচ্চমূল্যের বিনিময়েও বিশ্ব বাজার থেকে চাল কেনা দুরূহ হয়ে পড়ে। ফলে চাল ঘাটতি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চালের দাম যায় হু হু করে বেড়ে। তখন দেশের স্বল্প আয়ের মানুষদের পক্ষে চাহিদা অনুযায়ী চাল কেনা সম্ভব হয়ে ওঠে না বলে অর্ধভুক্ত এমনকি অভুক্ত থাকতে বাধ্য হয়। তখন এসব মানুষ ক্ষুধা মেটানোর জন্য ভাতের পাশাপাশি অথবা পরিবর্তে অন্য ভোজ্য যা কিছু পায় তা খেয়েই জীবন ধারণ করে। কিন্তু চালের দাম কমে ক্রয়ক্ষমতার মাঝে চলে এলেই ওইসব মানুষই আবার খাওয়ার উপযোগী সহজলভ্য ওই খাবারগুলো চালের সম্পূরক খাবার হিসেবে গ্রহণ করার কথা একেবারেই ভুলে যায়।

তবে একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো পৃথিবীর সব ভাত খেকো দেশের অধিবাসীরা তিন বেলা ভাত খেলেও তাদের মাথাপিছু দৈনিক চালের প্রয়োজন বাংলাদেশীদের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশের বেশি নয়। বাংলাদেশের মানুষদের যেখানে মাথাপিছু দৈনিক চালের প্রয়োজন প্রায় ৭৫০ গ্রাম, সেখানে অন্যান্য দেশের মানুষের মাথাপিছু দৈনিক প্রয়োজন ২৫০ থেকে ৩০০ গ্রামের মতো।

এর মূল কারণ ওইসব দেশের মানুষরা প্রত্যেকেই ভাতের পাশাপাশি নানা ধরনের সহজলভ্য সম্পূরক খাদ্য প্রতিদিন কিছু কিছু করে কয়েকবার খেয়ে থাকে। এসব সস্তা সম্পূরক খাদ্য পণ্যের সরবরাহ সারা বছর ধরে যথেষ্ট পরিমাণে থাকে বলেই সবাই এগুলো খেতে পায়।

এ প্রসঙ্গে এটাও লক্ষণীয় যে এসব দেশের মানুষরা পুষ্টিহীনতার শিকার হয় অনেক কম। সম্ভবত এককভাবে ভাতের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না হয়ে মিশ্র খাদ্যে অভ্যস্ত হওয়াতেই বিভিন্ন খাদ্য থেকে পাওয়া পুষ্টি উপাদানের মাধ্যমে তাদের দেহের পুষ্টি চাহিদা পূরণ হয় অনেকটা সুষম খাদ্য গ্রহণের মতোই। অথচ বাংলাদেশের অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, গ্রামাঞ্চলে বসবাসরত প্রায় শতকরা ১০০ ভাগ মানুষই তাদের পুরো খাদ্য চাহিদা মেটায় ভাত দিয়েই।

নিঃসন্দেহে ভাত বাঙালির প্রধান খাদ্য এবং এটি প্রধান খাদ্যই থাকবে, হয়তো আরও বহুদিন। তবে এ দেশের ক্রমবর্ধমান মানুষের টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা বিধানের তাগিদে ভাতের পাশাপাশি সম্পূরক খাদ্য যুক্ত হওয়া অপরিহার্য। কারণ খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য একমাত্র চালের ওপর বর্তমান চাপ এবং ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর চাহিদা মেটানোর জন্য চালের ওপর যে বর্ধিত নির্ভরশীলতা সৃষ্টি হবে তা একমাত্র চাল উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে মেটানো কখনই সম্ভব হবে না।

যার যেমন খুশি চলমান কৃষিপণ্য উৎপাদন কর্মকাণ্ড দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে যা থেকে বেরিয়ে আসাও দুষ্কর হয়ে পড়বে। বিষয়গুলো নিয়ে প্রয়োজনীয় সংক্ষিপ্ত আলোচনা এ নিবন্ধে অবশ্যই স্থান পাবে।

এর আগে বিভিন্ন সময়, বিশেষ করে জনগণের খাদ্য চাহিদা মেটাতে গিয়ে বিদেশ থেকে চাল আমদানিতে নানা ধরনের জটিলতার মুখে পড়ায় বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের অনেককেই বলতে শুনেছি ভাতের ‘বিকল্প’ হিসেবে আলু খাওয়ার কথা বলতে। কিন্তু ভাতের ‘বিকল্প’ শব্দটির ব্যবহার বিভ্রান্তকর। আমাদের সবারই মনে রাখা প্রয়োজন যে এ দেশের ভোতো জনগণের কাছে ভাতের ‘বিকল্প’ বলে  কিছু নেই। তবে যেটা তাদের কাছে অপ্রিয় হবে না এবং অদূর ভবিষ্যতে যেটা ক্রমান্বয়ে পছন্দনীয় হয়ে উঠবে সেটি হলো ভাতের নানাবিধ সম্ভাব্য ‘সম্পূরক’ খাদ্যপণ্য। তবে তা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধান সফলভাবে করতে হলে সুপরিকল্পিত ও বিজ্ঞান সম্মত উপায়ে সব ধরনের সম্পূরক খাদ্য পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি করে সারা বছর সরবরাহ নিশ্চিত করা। এটা করলেই ধীরে ধীরে চালের সম্পূরক খাদ্য খেতে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে  এ দেশের সব স্তরের জনগণ এবং একমাত্র চালের ওপর নির্ভরশীলতাও কমে আসবে তবে অনিবার্য কারণেই চালের টেকসই বর্ধিত উৎপাদন প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতেই হবে তাতে দ্বিমতের কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু তা একান্তভাবেই হতে হবে ‘বিজ্ঞানসম্মত’ ও ‘সুপরিকল্পিত’ উপায়ে যা অদ্যাবধি হয়ে ওঠেনি।

ধানের উৎপাদন বাড়াতে সরকারি উদ্যোগের পটভূমি :  তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের খাদ্য ঘাটতি কমানোর তাগিদে ধানের উৎপাদন বাড়ানোর কয়েকটি বাস্তব সম্মত সরকারি পদক্ষেপ নেয়া হয় সেই ১৯৫৪-৫৫ সালে। ধান একটি পানি-প্রিয় (হাইড্রোফিলিকি) ফসল। পানির ধারণক্ষমতাহীন অথবা দুর্বল ধারণক্ষমতা সম্পন্ন মাটির জমিতে ধানের আবাদ করলে (যা এখন হরহামেশাই করা হচ্ছে) এমন সব জমিতে ধানের উৎপাদন খরচ যায় যেমন বেড়ে, তেমনি ধানের কাক্সিক্ষত ফলনও পাওয়া যায় না। এমন সব জমিতে এক কেজি ধান উৎপাদন করতে যেখানে পানির প্রয়োজন হয় ৪ থেকে ৫ হাজার লিটার পানি, সেখানে পানি ধারণক্ষমতা সম্পন্ন মাটির জমিতে ধান আবাদ করলে সম পরিমাণ ধান উৎপাদনে পানির প্রয়োজন হয় ২০০০ থেকে ২৫০০ লিটার।

কাজেই ধানের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য অনিবার্য কারণেই পানি সেচ সুবিধা সৃষ্টি ও সম্প্রসারণের ব্যবস্থাটি প্রাধিকার পায় এবং এ জন্য অগভীর ও গভীর নলকূপের সাহায্যে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারই প্রাধান্য পায় এবং সঙ্গে সঙ্গে এ কাজটি শুরুও হয়ে যায়। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরিমাণ রাসায়নিক সার ও কীটনাশক দ্রব্যাদি আমদানি ও বিতরণ ব্যবস্থা গুরুত্ব পায়। ধান উৎপাদনকারীদের সুবিধার্থে হ্রাসকৃত মূল্যে সার এবং বিনামূল্যে কীটনাশক বিতরণের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়।

অগভীর ও গভীর নলকূপের ব্যবহার উৎসাহিত করার জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ প্রাপ্তির ব্যবস্থাও করা হয়। তবে এটি একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া হওয়ায় প্রাথমিক পর্যায়ে কাক্সিক্ষত গতি পায়নি। তবু ধীরগতিতে হলেও পানি সেচ ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে সম্প্রসারিত হতে থাকে এবং ধানের আবাদ এলাকা ও উৎপাদন দুই-ই বাড়তে থাকে কিন্তু ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদার বিপরীতে ধানের বর্ধিত উৎপাদন তাল মেলাতে না পারায় চালের আমদানির পরিমাণে তেমন হেরফের হয়নি স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্তও।

পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ৯ মাসের প্রলয়ঙ্করী যুদ্ধে সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত ভাতখেকো সাড়ে সাত কোটি জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য বাংলাদেশকে প্রতি বছর ৩০ থেকে ৪০ লাখ টন খাদ্য ঘাটতির বোঝা মাথায় নিয়েই যাত্রা শুরু করতে হয়। স্বাধীনতা অর্জনের উষালগ্ন থেকেই বাংলাদেশের খাদ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার আগেকার গৃহীত উদ্যোগকে বঙ্গবন্ধুর সরকার আরও সমন্বিত ও জোরদার করার সর্বাত্মক পরিকল্পিত প্রয়াশ নিয়েছিল। কিন্তু সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত চরম অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত দেশের পরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের সফল বাস্তবায়ন ঘটিয়ে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনের পথে দ্রুত এগোন সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা, সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার তাগিদে ধানের উৎপাদন বাড়ানোর সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এসব উদ্যোগের মাঝে ছিল-

১. পানি সেচ সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় দ্রুত সেচ সুবিধা সৃষ্টি ও সম্প্রসারণ করে সেসব এলাকায় ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল আধুনিক জাতের ধান বীজ সরবরাহ বৃদ্ধি করা,
২.  উন্নত ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রসার ঘটানো,
৩. প্রয়োজনীয় সব ধরনের রাসায়নিক সার ও কীটনাশক সামগ্রী কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য আমদানি ও বিপণনের প্রচলিত ব্যবস্থার যথাযথ পুনর্বিন্যাস সাধন করা,
৪.  সময়মতো প্রয়োজনীয় কৃষি ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঋণ বিতরণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মাত্র ১০ টাকায় ব্যাংকে একাউন্ট খোলার সুবিধা প্রদান,
৫. কোল্যাটারাল ছাড়া বর্গা চাষিদের ঋণ দান কাজ শুরু করা,
৬. কৃষক ভাইদের উৎপাদিত চাল ন্যায্য মূল্যে ক্রয়ের ব্যবস্থা ইত্যাদি কায্যক্রম অত্যন্ত সুচারুভাবে পরিচালনা করা।

চালের উৎপাদন বৃদ্ধিতে উল্লিখিত অনুঘটকগুলোর সফল প্রয়োগের ফলে ১৯৯৯ থেকে ২০০০ সালে চালের আমদানি শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলার অধিবাসীরা ক্ষুধা, দারিদ্র্য, পুষ্টিহীনতার চরম কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর জীবন যাপন করে আসছিল। এ দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা ‘মঙ্গা’ নামে অবহিত করা হতো। ১৯৯৬ থেকে ২০০০ সালে একটি বিশেষায়িত প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে দীর্ঘ দিনের ওই অসহনীয় পরিস্থিতি  থেকে ওইঅঞ্চলের জনসাধারণ বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়।

এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল উৎপাদন সক্ষম কৃষি পণ্যের বহুমুখীকরণের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া, বছরের শ্রম বিনিয়োগ সুযোগহীন সময়টাতে হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে বিনামূল্যে অথবা স্বল্পমূল্যে খাদ্যপণ্য সরবরাহ করার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।

২০০৮ সালে বর্তমান সরকার পুনরায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর চালের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য তাদের ১৯৯৬ থেকে ২০০১ এর চলমান কার্যক্রমগুলো আরও জোরালোভাবে কার্যকর করার পাশাপাশি কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয়। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি হলো-চালের এবং অন্যান্য কৃষি পণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর প্রক্রিয়ায় সুষম সার ব্যবহারে কৃষক ভাইদের উৎসাহিত করার জন্য পটাশ ও ফসফটিক ফারটিলাইজারের কেজিপ্রতি বিক্রির দাম যথাক্রমে ৬০ টাকা থেকে ১৫ টাকা এবং ৭২ টাকা থেকে ২২ টাকায় নামিয়ে আনা। এ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্তের ফলে কৃষকভাইরা ধানসহ অন্যান্য সব কৃষিপণ্য উৎপাদনে ইউরিয়া সারের পাশাপাশি পরিমিত পরিমাণ পটাশ ও ফসফেটিক সারের ব্যবহারে ব্যাপকভাবে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

এ বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ফলেই ধানের এবং অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি আলুর ফলনও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়ে যায়।
ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির সব কার্র্যক্রমকে সফলভাবে এগিয়ে নিতে কৃষক ভাইদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানে স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা বিধানে ১ কোটি ৪৩ লাখ ৭৫ হাজার কৃষককে উপকরণ সহায়তা কার্ড প্রদানও করা হয়েছে। এছাড়াও দেশের প্রায় এ কোটি কৃষক ভাইদের মাত্র ১০ টাকায় ব্যাংক একাউন্ট খোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এ সুবিধা অনেক কৃষকভাইরাই গ্রহণ করতে পারেনি তাদের সুবিধামতো স্থানে ব্যাংকের শাখা না থাকায়।

ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণের কারণ এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় : আগেই উল্লেখ করেছি যে, ভাত বাঙালির সব চেয়ে প্রিয় খাদ্য, গ্রাম বাংলায় বসবাসকারী দেশের ৭৫ শতাংশ মানুষই তিন বেলা পেট পুরে ভাত খেয়ে যে প্রশান্তি অনুভব করে অন্য কিছুতে তারা আর এতটা পরিতৃপ্ত হয় না। এছাড়াও গ্রামীণ মানুষের আনুষঙ্গিক সংসার খরচ মেটানোর মতো প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান হয় প্রায় সবার বাড়ির আঙিনায় তরিতরকারি আবাদ, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল, ভেড়া ইত্যাদি গৃহপালিত পশুপালনের মাধ্যমে।

এ সত্ত্বেও চরম দুর্যোগপ্রবণ এ দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত কারণে যদি ধানের উৎপাদন বিপর্যস্ত হয়, তাহলে কিনে খাওয়া মানুষের সংখ্যা হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় বাজারে চালের দাম হু হু করে বেড়ে যায়। তাতে স্বল্প আয়ের মানুষের পাশাপাশি শহরে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীও অশান্ত হয়ে ওঠে এবং তা ক্রমান্বয়ে সামাজিক অস্থিরতায় রূপান্তরিত হয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।

এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব ঠেকাতে চাল আমদানি এবং একক ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির সর্বাত্মক উদ্যোগ অদ্যবধি গৃহীত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত হয়ে এসেছে। তাই আজও দেশের পরিকল্পনাবিদরা তাদের পরিকল্পনা ভাবনায় আনতে পারেনি ভাতের সম্পূরক অন্যসব খাদ্য পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির ব্যবস্থা ও তা বাজারে বছরব্যাপী সরবরাহের নিশ্চয়তা বিধানের কথাটি, যা ছিল একান্তভাবেই অপরিহার্য এ দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা বিধানের জন্য।

এ কথাটিও সবারই একান্তভাবে মনে রাখা প্রয়োজন যে ভৌগলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ একটি চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ  অঞ্চল। বিগত কয়েক বছরের ধানের ক্রমবর্ধিত উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কারণ হলো অনুকূল পরিবেশ অর্থাৎ বিগত কয়েক বছর ধানের উৎপাদন প্রক্রিয়া বড় ধরনের তেমন কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়নি। ধানের এ বর্ধিত উৎপাদন দেখে সবাই সাময়িক স্বস্তি অনুভব করলেও কোনো ভিশন সমৃদ্ধ কৃষি বিজ্ঞানী এতে কখনই তৃপ্ত হতে পারবে না। কারণ এখানে আরও যে বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে লক্ষ করতে হবে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে হবে সেগুলো হলো-

১. পানি সেচ সুবিধা সম্প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে সেচ সুবিধাপ্রাপ্ত জমিতে ধানের আবাদ ও দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকে তা সে লাভজনক ধান চাষের উপযোগী হোক আর না-ই হোক এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে একই জমিতে একের পর এক এককভাবে ধানের আবাদই চলতে থাকে। এ অপরিকল্পিত এবং বিজ্ঞান সম্মত নয় এমন ধান উৎপাদন প্রক্রিয়া সার্বিক কৃষিপণ্য উৎপাদন পরিবেশের ওপর যে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে তার বিজ্ঞান সম্মত উপায়ে প্রতিবিধানের ব্যবস্থা না নিলে অদূর ভবিষ্যতে এমন এক জটিল অবস্থায় গিয়ে পৌঁছাবে যেখান থেকে ফেরত আসা দুরূহ হয়ে পড়বে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে আমাদের নীতি নির্ধারক ও পরিকল্পনাবিদরা আজও এসব বিষয়ের উপলব্ধির বাইরেই রয়ে গেছেন।

তাই অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে চলমান কৃষিপণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া সার্বিক পরিবেশের ওপর যেসব কারণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে চলেছে তার কয়েকটি সংক্ষিপ্ত আকারে নিচে উপস্থাপন করা হলো, এ আশায় যে নীতিনির্ধারক এবং পরিকল্পনাবিদরা এগুলোর গুরুত্ব উপলব্ধি করে ভবিষ্যত পরিকল্পনায় এর প্রতিবিধানের পদক্ষেপগুলো অন্তর্ভুক্ত করতে যথাযথভাবে।  

পানিপ্রিয় ফসল ধান লাভজনক উৎপাদন উপযোগী জমিতে শুধু না লাগিয়ে দুর্বল অথবা পানি ধারণক্ষমতাহীন জমিতেও লাগিয়ে মাত্রাতিরিক্ত পানি সেচের কারণে অতিরিক্ত উৎপাদন খরচ বহনের পাশাপাশি কাক্সিক্ষত ফলন না পাওয়া এবং অন্যদিকে ধানের চেয়ে অধিকতর লাভজনক অন্য ফসল ওই জমিটিতে না লাগানোর ফলে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অন্য একটি খাদ্যপণ্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি।

আপতিত আলোকরশ্মির সময় কালের তারতম্যের প্রভাবমুক্ত অনেকগুলো ধানের উচ্চফলনশীল আধুনিক জাত উদ্ভাবিত হওয়ায় সেচ সুবিধাপ্রাপ্ত অধিকাংশ জমিতে কৃষকভাইরা একের পর এক কেবলমাত্র ধানের আবাদই করে চলেছেন। এতে ধানের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়ে চলেছে তা অতি সংক্ষেপে নিচে উপস্থাপন করছি।

ক.     পৌনঃপৌনিকভাবে একই জমিতে সারা বছর ধরে একের পর এক শুধু ধানের আবাদ অব্যাহত রাখায় ধানের আক্রমণকারী অনিষ্টকারী কীটপতঙ্গ ও রোগবালাই নিরবচ্ছিন্ন বংশ বিস্তার ও ধ্বংসলীলা চালিয়ে যাওয়ার অবাধ সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। তাদের  আর কোনো বিকল্প ‘হোস্টের’ প্রয়োজন হচ্ছে না। ক্রমবর্ধমান এ আক্রমণ ও ধ্বংসলীলা কমাতে কৃষকভাইদের পরিবেশ বিধ্বংসী নানা ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক কীটপতঙ্গনাশক দ্রব্যাদির প্রয়োগও বাড়িয়ে দিতে হচ্ছে। ফলে সার্বিকভাবে ধানের উৎপাদন পরিবেশ বিনষ্ট হতে থাকে উৎপাদন খরচ বেড়ে চলে অথচ ধানের ফলনও ধীরে ধীরে কমে যায় ।

খ.    মাটির নিচের নির্দিষ্ট একটি স্তর (মাত্র ছয় ইঞ্চির মতো) থেকেই ধান গাছ প্রয়োজনীয় পুষ্টি আহোরণ করতে পারে। ফলে কেবল ওই স্তরে থাকা পুষ্টি উপাদানগুলোই ধান গাছ বারবার গ্রহণ করতে থাকায় স্বল্প সময়ের ব্যবধানে মাটিতে পুষ্টি উপাদানের ব্যাপক ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে কাক্সিক্ষত ফলন পাওয়ার জন্য কৃষকভাইদের প্রচলিত রাসায়নিক সারের ব্যবহার ও বাড়িয়েই চলতে হচ্ছে, তাতে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ বেড়ে চলেছে, অন্যদিকে মাটির ফসল উৎপাদন ক্ষমতাও দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।

গ.    একই জমিতে একর পর এক কেবল ধানের আবাদ চালিয়ে যেতে থাকলে মাটির অভ্যন্তরে ধানের শিকড় যতটা প্রবিষ্ট হতে পারে, তার কিছুটা নিচে দিয়ে একটি শক্ত মাটির স্তর (হার্ড প্লাউ প্ল্যান) সৃষ্টি হয়। তাতে ওই স্তরের নিচে বিদ্যমান পুষ্টি উপাদানগুলো সেখানেই রয়ে যায় বলে ধান গাছের নাগালে সেগুলো আর আসতে পারে না।

ঘ.    একই জমিতে একের পর এক কেবলমাত্র ধানের আবাদ করায় ওইসব জমিতে বর্ধিত মাত্রায় সার প্রয়োগ ও কীট ও বালাইনাশক বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্যাদি প্রয়োগের ফলে একদিকে যেমন প্রাকৃতিক ভারসম্য চরমভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে মাটির প্রধান জীবনীশক্তি মাটিতে অবস্থানরত অনুজীব (সয়েল মাইক্রোবস) এর সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। যার ফলে একই সঙ্গে প্রাকৃতিক ভারসম্য ও মাটির উৎপাদন ক্ষমতা দুই-ই বিনষ্ট হয়ে। চলমান অবস্থার প্রেক্ষিতে ধানের উৎপাদনশীলতা এবং উৎপাদন খরচের ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব অনিবার্য উঠছে।  

ঙ.    একই জমিতে একের পর এক ধান চাষ অব্যাহত রাখায় একটি ধানের ফসল, ক্ষেত থেকে কেটে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অতি দ্রুত জমি তৈরি করতে হয় পরবর্তী ধানের চারা রোপণের জন্য। ফলে, কাটা ধানের ‘নাড়া’গুলো কেটে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মাঠ থেকে তুলে নিয়ে অধিকাংশ সময় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যার ফলে মাটিতে পচে ওগুলো জমিতে জৈব পদার্থের মাত্রায় সংযোজিত হওয়ার কোনো সুযোগ পায় না, ফলে মাটির জৈব পদার্থের মাত্রা আর বাড়তে পারে না বরং ক্রমাগত কমেই যাচ্ছে।  

এছাড়াও নীতিনির্ধারক ও পরিকল্পনাবিদদের আরও যেসব বিষয়গুলো অবশ্যই ভাবনায় ধারণ করে এগুতে হবে সেগুলো হলো-
অনিবার্য কারণে প্রতি বছর কমপক্ষে এক শতাংশ হারে আবাদি জমি কমে যাচ্ছে তা যথাযথভাবে মোকাবিলার পথ ও পন্থা উদ্ভাবনের কথা।
দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কাক্সিক্ষত মাত্রায় কমে আসছে না। বিশেষ করে, দেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত গতিতে এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রতিটি অঙ্গনে সফল নেতৃত্বদান করতে সক্ষম উপযুক্ত জ্ঞান সমৃদ্ধ জনগোষ্ঠী যে পরিবেশে সৃষ্টি হওয়া সম্ভব সেই গণ্ডির বাইরের পরিবেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অপ্রতিহত গতিতে বেড়েই চলেছে। মনে রাখতে হবে সবাইকে যে এ অনিয়ন্ত্রিত ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর ভাতের চাহিদা মেটানোর প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে তালমিলিয়ে টেকসই ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি কখনই সম্ভব নয়।

চরম দুর্যোগপ্রবণ এ দেশে যে কোনো মাত্রার প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হেনে ধানসহ অন্যান্য সব কৃষিপণ্য বিনষ্ট করে দিতে পারে যে কোনো মুহূর্তে। এমন আশংকার কথা সব সময় মনে রেখে আবহাওয়া পরিবর্তনজনিত কারণে কৃষিপণ্য উৎপাদনের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে তা সুষ্ঠু ও সফলভাবে মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়গুলোও গভীরভাবে উপলব্ধি করা।

টেকসই বর্ধিত কৃষিপণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ মাত্রার সফলতায় এগিয়ে নেয়া নিশ্চিত করার জন্য কৃষি গবেষণা কার্যক্রমকে সমসাময়িক এবং সম্ভাব্য সব ‘আবায়োটিক’ ও ‘বায়োটিক’ সমস্যাকে সুষ্ঠু ও সফলভাবে মোকাবিলার উপযোগী করে গড়ে তোলার তাগিদে আরও শক্তিশালী ও যুগোপযোগী করার সফল প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়।

সর্বোপরি বাঙালি জনগোষ্ঠীকে একমাত্র খাদ্য, ভাতের মাঝে আবদ্ধ করে রাখার চিন্তা ভাবনা পরিহার করে এবং এককভাবে ধানের উৎপাদন বৃদ্ধির সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত  না রেখে ভাতের পাশাপাশি উৎপাদন সম্ভব সব শর্করা সমৃদ্ধ এবং অন্যান্য সম্পূরক কৃষিপণ্যের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি যথাযথ উপলব্ধিতে এনে এদের উৎপাদন ও সরবরাহ সব সময়ের জন্য নিশ্চিত করার যথাযথ সুপরিকল্পিত ও বিজ্ঞানসম্মত যাবতীয় উদ্যোগ নেয়ার বিষয়টি।

এ আলোচনা দীর্ঘায়িত না করার স্বার্থে অধিকাংশ উপস্থাপিত বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দেয়া থেকে বিরত থেকেছি। সব জমিতে এককভাবে ধানের আবাদকে, তা সে লাভজনক হোক আর নাই হোক, তাকে নিরুৎসাহিত না করার ফলে অন্যান্য কৃষিপণ্যের আবাদ ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ছে এবং সার্বিকপণ্য উৎপাদন পরিবেশের ওপর যে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তারও বিস্তারিত আলোচনা থেকে বিরত থাকছি। ভবিষ্যতে, প্রয়োজনবোধে বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা যাবে।
 
তবে এ পর্যন্ত এ প্রতিবেদনে সংক্ষেপে, যেসব বিষয়ের অবতারণা করেছি তার ওপর ভিত্তি করে সৃষ্ট সমস্যাগুলো থেকে উত্তরণের জন্য যেসব পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেছি সেগুলোই এখন উপস্থাপন করতে চাই এবং সেগুলো হলো-

বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষাপট গভীরভাবে অনুধাবন করে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে নীতিনির্ধারক ও পরিকল্পনাবিদদের প্রথমেই গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে যে খাদ্য হিসেবে এককভাবে ভাতের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ভাতের পাশাপাশি অন্যান্য সম্পূরক খাদ্য সামগ্রী খাওয়ায় এদেশের মানুষকে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে এবং সেই অভ্যস্ততা সৃষ্টির জন্য সব ধরনের সম্পূরক খাদ্য সামগ্রীর (ভুট্টা, কাওন, মিষ্টি আলু, কাসাবা ইত্যাদি) পরিমিত উৎপাদন ও বছরব্যাপী প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধানের জন্য সুপরিকল্পিত ও বিজ্ঞানসম্মত সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

চলমান চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার অবসান ঘটাতে হলে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নের আবাদি ও আবাদযোগ্য জমির মাটির আকার, আকৃতি, প্রকৃতি, পানি ধারণক্ষমতা ভেদে ধানসহ অন্যান্য আবাদযোগ্য ফসলের ‘সবচেয়ে উপযোগী’ এবং ‘উপযোগী’ জমি চিহ্নিত করে ইউনিয়ন ভিত্তিক ‘শস্য উৎপাদন ক্যালেন্ডার’ তৈরি করতে হবে।

চিহ্নিত ধান চাষের ‘সবচেয়ে উপযোগী’ ও ‘উপযোগী’ জমিতে ধানের আবাদ করতে হবে।
তবে ধান চাষ উপযোগী জমির বাইরের জমিগুলো একাধিক ফসলের আবাদ উপযোগী বলে বিবেচিত হবে চিহ্নিত এসব জমিতে মৌসুমভেদে যে ফসল সব চেয়ে লাভজনক হবে শস্য উৎপাদন ক্যালেন্ডারে সুস্পষ্টভাবে তারও উল্লেখ করতে হবে।

শস্য উৎপাদন ক্যালেন্ডারের নির্দেশ মোতাবেক শস্য উৎপাদন প্রক্রিয়া কার্যকরভাবে পরিচালনা করলে দেখা যাবে যে ধান চাষের উপযোগী নয় এমন জমিতে ধান চাষ করলে (যা এখন কৃষক ভায়েরা হরহামেশাই করছেন) ধানের উৎপাদন খরচ আশংকাজনক হারে বেড়ে যায় অন্যদিকে কাক্সিক্ষত ফলন থেকেও বঞ্চিত হয়। অথচ এসব জমিতে জমির উপযোগী ভুট্টা, গম, কাওন, কাসাবা ইত্যাদি ফসল অনেক কম করচে করা সম্ভব। ফলশ্রুতিতে ভাতের এসব সম্পূরক খাদ্য পণ্যের মোট উৎপাদন ও সরবরাহ ক্রমান্বয়ে একটা ইতিবাচক পর্যায়ে উপনীত হবে।  

প্রণীত ‘শস্য উৎপাদন ক্যালেন্ডার’ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে গেলে প্রথমেই যে সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে সেটি হলো সম্পূরক খাদ্য পণ্যগুলোর মান সম্পন্ন বীজের অভাব, বিশেষ করে ‘কাওন’ জাতীয় ফসলগুলোর উচ্চফলনশীল আধুনিক জাত ও উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তির অনুপস্থিতি।

এসব সমস্যা উত্তোরণের জন্য পরিকল্পিত বীজ বর্ধন কার্যক্রম দ্রুততার সঙ্গে সম্পাদন করতে হবে। একই সঙ্গে যে শস্যের উচ্চফলনশীল উন্নত জাতের অভাব রয়েছে, সেই শস্যের উন্নত জাত উদ্ভাবনের জন্য সংশ্লিষ্ট কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ‘ক্রাশ প্রোগ্রামের’ ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

ধানের উৎপাদন লাভজনক নয় এমন সব জমিতে ধানের পরিবর্তে ‘ফসল উৎপাদন ক্যালেন্ডারে’ উল্লিখিত যে কোনো ফসল উৎপাদন করলে কৃষক ভাইদের বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের পাশাপাশি ধানের উৎপাদন অনুপযোগী জমিতে ধানের আবাদ করলে সব রকমের ভর্তুকি প্রদান বন্ধ করে দিতে হবে। তাতে কৃষক ভাইরা একদিকে যেমন ধানের সম্পূরক কৃষিপণ্য উৎপাদনে উৎসাহিত হবেন, অন্যদিকে অনুপযোগী জমিতে ধানের আবাদে নিরুৎসাহিত করাও সম্ভব হবে।

অতি প্রয়োজনীয় ইউনিয়নভিত্তিক শস্য উৎপাদন ক্যালেন্ডার তৈরির কাজ সুষ্ঠুভাবে দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করতে স্থানীয় কৃষিজীবী জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদেরই প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। তবে এ কাজের শুরুতেই স্থানীয় জমির পর্চা ছাড়াও জমির মাটির প্রকারভেদে যে যে ফসল আবাদ হয় তার তথ্যাদিও সংগ্রহ করতে হবে। তবে ধান চাষের অনুপযোগী জমিতে যেসব ফসল আবাদ করা সম্ভব তা চিহ্নিত করার পর কোন এলাকায় কোন মৌসুমে, কোন ফসলটি সবচেয়ে লাভজনকভাবে উৎপাদন করা যাবে সেটি নিশ্চিত করতে কৃষি গবেষকদের সহায়তা নিতে হবে।  

আবহাওয়া পরিবর্তনজনিত কারণ ছাড়াও নির্ধারিত একটি ফসলের আবাদ সর্বোচ্চ মাত্রায় লাভজনক নাও থাকতে পারে। ফলে অবস্থার প্রেক্ষিতে অন্য যে ফসলটি অধিকতর লাভজনক বলে বিবেচিত সেটিই আবাদে নিয়ে আসতে হবে। প্রতিটা জমি, তা ধান চাষের উপযোগী অথবা অনুপযোগী যাই হোক না কেন তার উর্বরতা শক্তি শুধু সংরক্ষণই নয়, বৃদ্ধির সর্বাত্মক বিজ্ঞানসম্মত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। বিশেষ করে, মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণকে প্রয়োজনীয় মাত্রায় উন্নীত করে তা স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ প্রাধিকার ভিত্তিতে গ্রহণ করতে হবে।

সর্বোপরি চলমান নিয়ন্ত্রণহীন জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যে কোনো মূল্যে সর্বাত্মক সমন্বিত উদ্যোগে স্থিতিশীল লক্ষ্যমাত্রায় নামিয়ে আনতেই হবে এবং সেই লক্ষ্যমাত্রা ০.৫ শতাংশ হওয়া বাঞ্ছনীয় বলে মনে করি এটা করতে ব্যর্থ হলে এ দেশের ভবিষ্যৎ জনগোষ্ঠীর টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা বিধানের সব প্রচেষ্টায়ই চরম বেদনাদায়ক ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে-তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। ইউনিয়নভিত্তিক উৎপাদন ক্যালেন্ডারকে কার্যকরীভাবে বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় কৃষকভাইদের অবহিত ও উদ্বুদ্ধ করার প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে। এ কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য প্রতি মাসে অন্তত একবার আলোচনা সভা করার প্রয়োজন হবে। কাজেই প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে আলোচনা অনুষ্ঠানের উপযুক্ত স্থান ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থাকতে হবে। যে ইউনিয়নে এটি নেই, সেটি অবশ্যই সেখানে তৈর করতে হবে।
 
ড. মো. আমীরুল ইসলাম
* অবসরপ্রাপ্ত মহাপরিচালক, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭৪৭৫৭০৫৪৪

 


Share with :

Facebook Facebook