কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

মোহনীয় ফল স্ট্রবেরি ভিন্নকথা

ট্রবেরি মোহনীয় লোভনীয় মনোহরি সুস্বাদু উচ্চমূল্যের ফল। স্ট্রবেরির মনোহরি রঙ আর আকার এমন কেউ নেই যাকে বিমোহিত না করে। হয়তো এটি আমাদের ফল নয় বলে এর স্বাদ রুচি কোনটাই এখন আমাদের আসল অর্থে জনপ্রিয়তার পর্যায়ে নেয়া যায় না। অনেকেই প্রচার প্রচারণায় বলেন বাম্পার ফলন, লাখ টাকা কোটি টাকা আয়। এসব চমকীয় চটকদার প্রচারণা। আসল অর্থে কৃষির লাভের চেয়ে লোকসানটাই বেশি হয়। এ দেশের কৃষিতে সার্বিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য আমাদের আর্থসামাজিকতা, বোধ, মিথ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, চাহিদা, বাজার এগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। স্ট্রবেরি কি এখনো সেভাবে আমাদের কাজে লেগে সার্বিকতার নজর কাড়তে পেরেছে? কিংবা আরো গভীরে গিয়ে যদি বলি আমাদের ষোলোকলা পূর্ণ করতে পেরেছে? না পারেনি সেভাবে আসল অর্থে। বিদেশি ফল বলে নয় কৃষকের মন মানসিকতা, ইচ্ছা আর লাভের কথা চিন্তা করেই সব কাজে এগোতে হবে যৌক্তিকভাবে। হুজুগে শুরু করে আবার কলিতে বিনষ্ট হলে কোন কাজ দিয়েই কৃষি অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ বা সুদৃঢ় করা যাবে না। ভেবেচিন্তে উদ্যোগী হলে পরিণামে লাভ বেশি হয়। ফল বিশেষজ্ঞ ড. মুন্সী রাশীদ আহ্মদ বলেন স্ট্রবেরি আমাদের প্রচলিত ফলের মতো খাওয়ার ফল নয়। এটি আসলে সতেজ/তাজা (Fresh Fruit) হিসেবে যতটুকু না জনপ্রিয় ও ব্যবহৃত হয় তার চেয়ে প্রক্রিয়াজাতকরণ (Processing fruit) ফল হিসেবে বেশি কার্যকর, জনপ্রিয় এবং ব্যবহৃত হয়। স্ট্রবেরি ফল হিসেবে খাওয়া ছাড়াও বিভিন্ন খাদ্যের সৌন্দর্য ও ঘ্রাণ বাড়াতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া জ্যাম, জুস, জেলি, ক্যান্ডি, মিল্কশেক, শরবত, মিশ্র তরল বানাতে বেশ উপযোগী। এটি ডেকোরেশন, চমক, আকর্ষণ বাগড়াতে, ভ্যালুঅ্যাড করতে উপযোগী ফল। এটিকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে লাভজনক করতে হলে অবশ্যই পুরো পোলট্রি শিল্পের বিভাজনের মতো এর চারা উৎপাদন, ফল উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণ, ব্যবহার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করার জন্য আলাদা ৩টি সেক্টরে ভাগ করে কাজ করতে হবে। একই মানুষ বা একই উদ্যোগে ৩টি কাজ লাভজনকভাবে করতে পারবে না বা সহজসাধ্য নয়। কেননা চারা উৎপাদনে আলাদা ও বিশেষ গুরুত্ব ও দক্ষতার প্রয়োজন হয়। চারা উৎপাদনকারীরা শুধুই চারাই সরবরাহ করবে। আবার ফল উৎপাদনকারীরা শুধু ফল উৎপাদন করবে এবং উৎপাদনের পর অন্যরা শুধু বাজারজাতকরণ বা প্রক্রিয়াজাতকরণে সম্পৃক্ত থাকবে।
 

 স্ট্রবেরি ছোট ঝোপালো লতানো/গুল্ম প্রকৃতির গাছ থেকে হয়। এর শক্ত কোন কা- বা ডালপালা নেই। পাতা সবুজ, ছোট, কিনারা খাঁজকাটা, থানকুনি পাতার মতো; পাতার বোঁটাও লম্বা, সরু, নরম এবং বেশ বাহারি লোমশ। ঝোপের মধ্যেই ছোট ছোট ঘণ্টার মতো সাদা বা ঘিয়া রঙের ফুল ফোঁটে। সরু সুতার মতো বোঁটার মাথায় একটি একটি করে ফল ধরে। কাঁচা ফলের রঙ প্রথমে সবুজ, ক্রমে সাদা এবং পাকলে উজ্জ্বল টকটকে লাল হয়। স্ট্রবেরির ফল আর দশটি ফলের মতো সাধারণ ১টি ফল নয়। এটি একটি পরিবর্তিত যৌগিক ফল। ফলের খাওয়ার উপযোগী রসাল লাল অংশটি পরিবর্তিত স্ফিত থ্যালামাস এবং এর উপর কাল/হলুদ বর্ণের দানাগুলো প্রকৃত বীজ। এক থোকাতে অনেকগুলো ফল ধরে। আকর্ষণীয় রঙ, গন্ধ ও উচ্চ পুষ্টিমানের জন্য স্ট্রবেরি বিশ্বব্যাপী খুবই জনপ্রিয় ও সমাদৃত। এতে ভিটামিন সি ছাড়াও পর্যাপ্ত পরিমাণে অন্যান্য ভিটামিন, খনিজ পদার্থের পাশাপাশি মানবদেহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু জৈব এসিড ও এন্টিঅক্সিডেন্ট (ইল্লাজিক এসিড) রয়েছে; যা বার্ধ্যক্য ও ক্যান্সার প্রতিরোধে খুবই কার্যকরী প্রমাণিত হয়েছে। তাছাড়া ত্বকের পরিচর্যার জন্যও স্ট্রবেরি বহুল সমাদৃত।
 
স্ট্রবেরির খুব বেশি জাত এখনো আমাদের দেশে আসেনি। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বারি স্ট্রবেরি-১ নামে একটি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে এবং আরো দুটি উচ্চফলনশীল জাত মুক্তায়নের অপেক্ষায় আছে। জাত ৩টি বাংলাদেশের সব জায়গায় চাষ করা যায়। নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে গাছে ফুল আসতে শুরু করে এবং ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত ফল সংগ্রহ করা যায়। জানুয়ারি ফেব্রুয়ারিতে অর্থাৎ বেশি শীতে যে ফল আসে সেগুলো গুণে মানে স্বাদে সৌন্দর্যে আকারে বেশি মাতোয়ারা করে। প্রতি গাছে গড়ে ৬০ থেকে ৭৫টি ফল  ধরে যার গড় ওজন সাধারণভাবে ৩৫০ থেকে ৫০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়। গড়ে গাছপ্রতি ৪৫০ গ্রাম। বিক্রয়যোগ্য প্রতিটির গড়পরতা ওজন ২৫ থেকে ৩০ গ্রাম। প্রিমিয়াম বা ভালো আকারের ফলগুলো ৪৫ থেকে ৫০ গ্রামের হয়। গড়ে প্রতিটি ফল ১৫ গ্রামের হয়। হেক্টরপ্রতি ফলন ১০ থেকে ১২ টন। এ জাতের পাকা ফল আকর্ষণীয় টকটকে লাল বর্ণের। জাতটি যথেষ্ট পরিমাণে সরু লতা হতে উৎপন্ন চারা/রানার উৎপাদন করে বলে এর বংশবিস্তার সহজ। এছাড়াও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভাবিত জাত রাবি-১, রাবি-২, রাবি-৩ এবং মডার্ন হর্টিকালচার সেন্টার, নাটোর থেকে সরবরাহকৃত জাত মডার্ন স্ট্রবেরি-১, মডার্ন স্ট্রবেরি-২, মডার্ন স্ট্রবেরি-৩, মডার্ন স্ট্রবেরি-৪, মডার্ন স্ট্রবেরি-৫, আমাদের দেশে চাষযোগ্য জাত হিসেবে আস্তে আস্তে জনপ্রিয়তার দিকে এগোচ্ছে। বাংলাদেশে চাষকৃত জাতগুলোর মধ্যে সবগুলোই প্রবর্তন (Introduction) এবং নির্বাচন (Selection) মাধ্যমে প্রচলিত হয়েছে।
 
স্ট্রবেরি মূলত শীত প্রধান অঞ্চলের ফসল। এর আবাদি উৎস দেশে কখনো কখনো বরফ পড়ে। ফুল ও ফল আসার সময় শীতল ও শুকনো আবহাওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের আবহাওয়া রবি মৌসুমে স্ট্রবেরি চাষের উপযোগী। সুনিষ্কাশিত উর্বর দো-আঁশ থেকে বেলে দো-আঁশ সমতল মাটি স্ট্রবেরি চাষের জন্য উপযোগী। যেসব জমিতে পানি জমে সেখানে স্ট্রবেরি ফলানো যাবে না। জমি ভালোভাবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে গভীরভাবে অন্তত ১ ফুট গভীর চাষ দিতে হবে। শেষ চাষের সময় পরিমাণমতো সার  মাটিতে মিশিয়ে দিতে হবে। স্ট্রবেরির চারা মধ্য আশ্বিন থেকে মধ্য কার্তিক (অক্টোবর) মাসে রোপণের উপযুক্ত সময়। তবে নভেম্বর ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত স্ট্রবেরি চারা রোপণ করা যায়। চারা রোপণের জন্য জমিতে বেড তৈরি করে নিতে হবে। প্রতিটি বেড প্রায় ৩ ফুট প্রশস্ত করে তৈরি করতে হবে। দুই বেডের মধ্যে ১ থেকে ১.৫ ফুট চওড়া নালা রাখতে হবে। প্রতি বেডে দুই লাইনের মধ্যে ১.৫ থেকে ২ ফুট দুরত্ব রাখতে হবে। প্রতিটি লাইনে ১ থেকে ১.৫ ফুট দূরে দূরে চারা রোপণ করতে হবে। এ হিসাবে প্রতি শতকে প্রায় ১৫০টি চারা রোপণ করা যায়।
 
ভালো ফলনের জন্য জমিতে পরিমাণমতো সার দিতে হবে। মাটি পরীক্ষা করে সার দিলে ফলন ভালো হয়। সাধারণ হিসেবে প্রতি শতক জমিতে সারের পরিমাণ  হলো শুকনো পচা গোবর ১২০ কেজি, ইউরিয়া ১ কেজি, টিএসপি ৮০০ গ্রাম, এমওপি ৯০০ গ্রাম, জিপসাম ৬০০ গ্রাম; শেষ চাষের সময় সম্পূর্ণ গোবর, টিএসপি, জিপসাম ও অর্ধেক পরিমাণ এমওপি সার জমিতে ছিটিয়ে মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। ইউরিয়া ও অবশিষ্ট এমওপি সার চারা রোপণের ১৫ দিন পর থেকে ১৫ থেকে ২০ দিন পর পর ৮ থেকে ৫ টি কিস্তিতে উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। জমিতে রসের অভাব দেখা দিলেই প্রয়োজনমতো পানি সেচ দিতে হবে। ফল উৎপাদনের সম্পূর্ণ সময়টিতে বেশ কয়েকবার সেচ দিতে হয়। একই সাথে মনে রাখতে হবে স্ট্রবেরি জলাবদ্ধতা একদমই সহ্য করতে পারে না।  তাই বৃষ্টি বা সেচের অতিরিক্ত পানি দ্রুত বের করে দিতে হবে।
 
স্ট্রবেরি বীজ এবং রানারের (কচুর লতি/থানকুনির মতো লতা) মাধ্যমে বংশবিস্তার করে। তাই আগের বছরের গাছ নষ্ট না করে জমি থেকে তুলে  জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ হালকা ছায়াযুক্ত স্থানে রোপণ করতে হবে। সে গাছ থেকে উৎপন্ন রানারের পর্বসন্ধি হতে শিকড় বের হলে তা মাতৃগাছ থেকে কেটে সুষমভাবে মিশ্রিত ৫০ ভাগ গোবর ও ৫০ ভাগ পলিমাটিযুক্ত পলিথিন ব্যাগে রোপণ করতে হবে। এরপর পলিথিন ব্যাগসহ চারাটি হালকা ছায়াযুক্ত স্থানে সংরক্ষণ করতে হবে। অতিরিক্ত বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষার জন্য চারার ওপর পলিথিনের ছাউনি দিতে হবে। রানারের মাধ্যমে বংশবিস্তার করা হলে স্ট্রবেরির ফলন ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। তাই জাতের ফলন ক্ষমতা অক্ষুন্ন রাখার জন্য ২-৩ প্রজন্ম পরপর টিস্যু কালচারের মাধ্যমে উৎপাদিত চারা ব্যবহার করা ভালো। বিশিষ্ট ফল বিজ্ঞানী এবং স্ট্রবেরি বিশেষজ্ঞ ড. মুন্সী রাশীদ আহমদ বলেন, এ দেশে স্ট্রবেরি উৎপাদনে চারা উৎপাদন বা চারা প্রাপ্তি বেশ সমস্যাজনক। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে অবশ্যই পোলট্রি শিল্পের মতো একটি সেক্টরে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে মাতৃচারা তৈরি এবং রানার উৎপাদন; দ্বিতীয় সেক্টরে মূল জমিতে স্ট্রবেরি ফল উৎপাদন; এবং তৃতীয় সেক্টরে বাজারজাত ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ করতে হবে। তবেই কেবল স্থিতিশীল লাভজনকভাবে স্ট্রবেরি আমাদের দেশে উৎপাদন করা যাবে।
 
সরাসরি মাটির সংস্পর্শে এলে স্ট্রবেরির ফল পচে নষ্ট হয়ে যায়। এ জন্য প্রথম ফুল আসার পরপরই স্ট্রবেরির বেড খড় বা কালো পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। প্রতি লিটার পানিতে ৩ মিলিলিটার ডার্সবান ২০ ইসি ও ২ গ্রাম ব্যাভিস্টিন ডিএফ মিশিয়ে সে দ্রবণে খড় শোধন করে নিলে তাতে উঁইপোকার আক্রমণ হয় না এবং দীর্ঘ দিন তা অবিকৃত থাকে। জমি সব সময় আগাছামুক্ত রাখতে হবে। গাছ লাগানোর পর তার গোড়া থেকে প্রচুর রানার বা কচুর লতির মতো লতা বের হতে থাকে। এগুলো মাতৃগাছ থেকে খাদ্য আহরণ করে ফুল ও ফল আসা বিলম্বিত করে। এতে ফলন ভালো হয় না, কমে যায়। এ জন্য ফল উৎপাদনের সময় রানারগুলো ১০ থেকে ১৫ দিন পর পর কেটে  ফেলতে হবে।
 
অ্যানথ্রাকনোজ স্ট্রবেরির একটি ছত্রাকজনিত রোগ। এর আক্রমণ পাতা, ফল, রানার এবং ক্রাউনে বা শীর্ষ মুকুলে দেখা যায়। তবে ক্রাউন রুটই (Crown Rot সবচেয়ে ক্ষতিকর। Colletotrichum gloeosporioides নামক ছত্রাক এ রোগের কারণ। এর প্রতিকারের জন্য অনুমোদিত ছত্রাকনাশক টিল্ট প্রতি লিটার পানির সঙ্গে ০.৫ মিলিলিটার হারে মিশিয়ে ৭ থকে ১০ দিন পরপর ২ থেকে ৩ বার গাছের গোড়াসহ সর্বত্র স্প্রে করতে হবে। এক ধরনের ছত্রাকের আক্রমণে পাতায় দাগ পড়া রোগ হয়। এ রোগের আক্রমণে ফলন কমে যায় ও ফলের গুণগতমান কমে যায়। ফল পচা রোগের আক্রমণে ফলের গায়ে জলে ভেজা বাদামি বা কালো দাগের সৃষ্টি হয়। দাগ দ্রুত বেড়ে যায় এবং ফল খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে যায়। যেহেতু গাছে ফল আসা শুরু করলে বিভিন্ন গাছে বিভিন্ন পর্যায়ের ফল সবসময়ই বিরাজ করে, তাই গাছে ফল আসার পর কোনো প্রকার ছত্রাকনাশক/কীটনাশক প্রয়োগ করা ঠিক হবে না। এ ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাই শ্রেয়। যেমন- মাঠ আগাছামুক্ত, আবর্জনামুক্ত (মরা পাতা ও পচা ফল) রাখা এবং ছত্রাকনাশক ও কীটনাশক দ্বারা শোধিত খড় দিয়ে মালচিং করা।
 
নার্সারিতে চারা উৎপাদনের সময় এবং মাঠে চারা রোপণের অব্যবহিত পরে গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় গাছে মাকড়ের আক্রমণ দেখা দেয়। মাকড়ের আক্রমণে স্ট্রবেরি গাছের বাড়বাড়তি, ফলন ক্ষমতা ও গুণগতমান মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। এদের আক্রমণে পাতা তামাটে বর্ণ ধারণ করে ও পুরু হয়ে যায়, আস্তে আস্তে কুঁকড়ে যায় এবং অনেক অনাকাক্ষিত শাখা প্রশাখা গজায়। গাছের স্বাভাবিক বাড়বাড়তি ব্যাহত হয়। এ জন্য ভারটিমেক/অ্যাবামেকটিন (মাকড়নাশক) প্রতি লিটার পানির সাথে ১ মিলিলিটার হারে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর ২ থেকে ৩ বার পাতার নিচে স্প্রে করতে হবে। বুলবুলি পাখি স্ট্রবেরির সবচেয়ে বড় শত্রু। ফল আসার পর সম্পূর্ণ পরিপক্ব হওয়ার  আগেই পাখির উপদ্রব শুরু হয়। এজন্য ফল আসার পর উঁচু করে সম্পূর্ণ বেড/মাঠ জাল দিয়ে ঢেকে দিতে হবে যাতে পাখি ফল খেয়ে নষ্ট করতে না পারে। এ ছাড়া মেরুদণ্ডী প্রাণির মধ্যে ইঁদুর ও শিয়াল ফসল নষ্ট করতে পারে।
 
স্ট্রবেরি গাছ প্রখর সূর্যের আলো ও বেশি বৃষ্টি সহ্য করতে পারে না। এজন্য এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত হালকা ছায়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ফল সংগ্রহের পর সুস্থ সবল গাছ মাঠ থেকে তুলে পলিথিন ছাউনির নিচে রোপণ করলে মাতৃগাছকে সূর্যের খরতাপ ও ভারি বৃষ্টির ক্ষতি থেকে রক্ষা করা যায়। এ সময় তাদের বাড়বাড়তি বেশি হয় না। মাতৃগাছ থেকে উৎপাদিত রানার পরবর্তী সময়ে চারা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সে রানারকে অফ সিজনে/অমৌসুমে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে যেন পরবর্তী মৌসুমে মানসম্মত চারা পাওয়া যায়।
 
আশ্বিন মাসের মাঝামাঝি (অক্টোবর মাসের শুরু) সময়ে রোপণকৃত বারি স্ট্রবেরি-১ এর ফল সংগ্রহ পৌষ মাসের মাঝামাঝি শুরু হয়ে চৈত্রের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলে। ফল পেকে লাল রঙ হলে ফল সংগ্রহ করতে হয়। স্ট্রবেরির সংরক্ষণকাল খুব কম হওয়ায় ফল সংগ্রহের পর পরই তা টিস্যু পেপার স্টাইরোফোমের নেটের জ্যাকেট দিয়ে মুড়িয়ে প্লাস্টিকের ঝুঁড়ি বা অনূর্ধ্ব ৯ ইঞ্চি উচ্চতা বিশিষ্ট ও ছিদ্রযুক্ত শক্ত কাগজের কার্টুনে এমনভাবে  সংরক্ষণ করতে হবে যাতে ফল গাদাগাদি অবস্থায় না থাকে। ফল সংগ্রহের পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাজারজাত করতে হবে। স্ট্রবেরি উৎপাদনকারী কৃষকরা ফল তোলার পর বিশেষ রাবার-প্লস্টিকের নেটের জালি দিয়ে প্যাকিং করে রাখেন। এতে পরিবহনে সমস্যা হয় না। বাজারে বিক্রির আগে মোড়ক খুলে অক্ষত সতেজ ফল বিক্রি করেন । মৌসুমের শুরুতে জানুয়ারিতে প্রতি কেজি ১ হাজার  থেকে ১২শ’ টাকা দামে বিক্রি হয়। তবে গরম বাড়তে থাকলে ফেব্রুয়ারির পর দাম কমতে থাকে এবং পরে ২শ’ থেকে ৩শ’ টাকা কেজি দামেও বিক্রি হয়। আমাদের দেশে গড়ে প্রতি বিঘায় উৎপাদন খরচ ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়। হেক্টরে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা। তবে আরো বেশি ব্যবস্থাপনা আর যত্নে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকাও আয় করা যায় স্ট্রবেরি আবাদ করে। স্ট্রবেরির গুণগত মান আকার মূলত তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে। সেজন্য জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি মাসে ফল আসে এমন হিসাব করেই স্ট্রবেরি আবাদ করতে হবে।
 
আবারো ফলবিজ্ঞানী মুন্সী রাশীদ আহ্মদের মতে বলি, স্ট্রবেরি আমাদের দেশে অবশ্যই লাভজনকভাবে আবাদ করা যাবে। তবে অবশ্যই তা পরিকল্পিতভাবে করতে হবে। এবং তা অবশ্যই ৩টি সেক্টরে ভাগ করে পোলট্রি শিল্পের মতো করে করতে হবে। এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায় স্ট্রবেরি এ দেশের ফল হয়ে গেছে আবহাওয়া জলবায়ুর সাথে খাপ খেয়ে। এখন শুধু প্রয়োজন এর বাকি ব্যবস্থাপনা। মনে রাখতে হবে স্ট্রবেরি ফল সরাসরি খাওয়ার জন্য নয়। কেননা এ ফলটি তোলার পর অতি অল্প সময়ের মধ্যে পঁচে নষ্ট হয়ে যায়। সেদিকটি খেয়াল করে এর চারা উৎপাদন, ফল উৎপাদন এবং ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণে আলাদাভাবে গুরুত্ব দিয়ে এগোতে হবে। আর স্ট্রবেরির কেক, দই, আইসক্রিম, জুস, জ্যাম, ক্যান্ডি, শরবত, মিল্কশেক, মিশ্রতরল কিংবা খাবার সাজাতে তুলনাহীন লোভনীয়, আকর্ষণীয় আইটেম হিসাবে ব্যবহারের কথা স্মরণ রেখে, পরিকল্পিতভাবে সবদিক চিন্তা করে কর্মসূচি গ্রহণ করলে স্ট্রবেরি নিয়ে আমরা অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারব। যারা স্ট্রবেরি সম্পর্কে বুঝেন, গবেষণা করেছেন, গবেষণা ফলাফল হাতে আছে, তাদের সাথে আলাপ করে সামনে এগোতে হবে। স্ট্রবেরি একদিন আমাদের গর্বিত ফল হিসেবে আমাদের ব্যঞ্জরিত উন্নয়ন আর সমৃদ্ধিকে আরো বেগবান করবে, আমাদের কৃষির এ অংশকে দূর বহুদূরে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এ লেখাটিকে পরিপক্ব সমৃদ্ধ করতে মুন্সী রাশীদ আহ্মেদ আন্তরিক সহযোগিতা করেছেন। স্ট্রবেরি সম্পর্কে যেকোন জিজ্ঞাসার জন্য তার সাথে যোগাযোগ করা যায়।
 
 
কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম
* উপপরিচালক (গণযোগাযোগ), কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা
 

Share with :

Facebook Facebook