কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

ভেবে-চিন্তে খাই-অপচয় কমাই

প্রভাতের রবি, রাতের জোছনা, নদীর কলতান, পাখির গুঞ্জন প্রভৃতি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐশ্বর্যে আমরা প্রতিদিনই বিমোহিত হই। কিন্তু আমরা আমাদের দৈনন্দিন অবিবেচক কর্মকাণ্ডের দ্বারা একদিকে যেমন জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছি অপরদিকে পরিবেশ দূষণের মাত্রাও বৃদ্ধি করে চলেছি। অথচ জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণের বিরূপ প্রভাবে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের একমাত্র বাসযোগ্য গ্রহ পৃথিবীর পরিবেশ ও জীবন আজ নানাভাবে বিপর্যস্ত। কৃষি পরিবেশও এর থেকে রেহাই পায়নি। গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলে জানা গেছে, বৈজ্ঞানিক নানা কলাকৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে পূর্বের তুলনায় বর্তমানে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও ভূমির সুপ্ত উৎপাদন ক্ষমতা ধীরে ধীরে নিঃশোষিত হয়ে যাচ্ছে। স্বাভাবিক কারণেই খাদ্য গ্রহণে আমাদের মিতব্যায়িতা অবলম্বনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। অপরদিকে সঠিক পুষ্টি জ্ঞানের অভাবও আমাদের মধ্যে রয়েছে। একটি তথ্যে দেখা গেছে, বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ দিনে তিন বেলা পেট পুরে খেতে পায় না অথচ মানুষ কর্তৃক বিশ্বের মোট উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ খাদ্য অপচয় হচ্ছে। বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিয়ে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি ২০১৩ সালে পরিবেশ দিবসের জন্য প্রতিপাদ্য ‘ভেবে-চিন্তে খাই- অপচয় কমাই’ গ্রহণ করে।
 
মানুষের মৌলিক চাহিদা হলো অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা। এগুলোর মধ্যে আবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অন্ন বা খাদ্য। এটি না থাকলে মানুষ কোনোভাবে বেঁচে থাকতে পারে না। খাদ্যের গুরুত্ব সম্পর্কে বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের উক্তিটি এখানে স্মরণযোগ্য। তিনি বলেছিলেন ‘I would rather take care of the stomachs of the living than the glory of the departed in the form of monuments..’
      ভেবে-চিন্তে খেলে অপচয় কম হয়। খাদ্য গ্রহণে বিজ্ঞানভিত্তিক দুটি বিষয় মনে রাখতে হবে। ১. বয়স, লিঙ্গ, শারীরিক কাজ, শরীরের ওজন, উচ্চতা অনুযায়ী খাদ্য গ্রহণ করতে হবে অর্থাৎ প্রয়োজনীয় পরিমাণ ক্যালরি গ্রহণ করতে হবে ২. দৈনিক খাদ্য তালিকায় ছয়টি খাদ্য উপাদান যেমন শর্করা, আমিষ, স্নেহ, ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানি সঠিক অনুপাতে গ্রহণ করতে হবে। খাদ্য গ্রহণের সময় যদি আমরা তা অনুসরণ না করি তবে কয়েকটি সমস্যার সৃষ্টি হবে। ১. কম খাদ্য গ্রহণে স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটবে। ২. বেশি খাদ্য গ্রহণে স্থূলকায় হওয়াসহ নানাবিধ শারীরিক অসুবিধা দেখা দিবে। ৩. বেশি খাদ্য গ্রহণে খাদ্যের অপচয় হবে। সুতরাং ভেবে-চিন্তে খাদ্য গ্রহণ করলে একদিকে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া যায় অপরদিকে খাদ্যের অপচয় রোধ করা যায়।

 
বয়স, লিঙ্গ, শারীরিক কাজ প্রভৃতি বিবেচনায় আমাদের প্রত্যেকের শরীরে ভিন্ন ভিন্ন পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হয়। এই শক্তি কিলোক্যালরিতে পরিমাপ করা হয়। পুষ্টিবিদ শাহীন আহমেদ এর মতে, মাঝারি শ্রম বিবেচনায় ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী ছেলের জন্য ২৬০০ কিলোক্যালরি ও ১৬ থেকে ১৯ বছর বয়সী ছেলের জন্য ২৮০০ কিলোক্যালরি খাদ্য শক্তির প্রয়োজন। অপরদিকে ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী মেয়ের জন্য ২০০০ কিলোক্যালরি ও ১৬ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়ের জন্য ২১০০ কিলোক্যালরি প্রয়োজন। মাঝারি শ্রম বিবেচনায় ৫৫ ও ৬৫ ওজনের পুরুষের জন্য যথাক্রমে ২৫৩০ ও ৩০০০ কিলোক্যালরি প্রয়োজন, অপরদিকে ৪০ ও ৫০ ওজনের মহিলার জন্য প্রয়োজন যথাক্রমে ১৬০০ ও ২০০০ কিলোক্যালরি।
 
আমাদেরকে সুষম আহার (Balanced diet) করতে হবে। দেহের পুষ্টি চাহিদা পূরণের জন্য যে আহারে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান পরিমাণ মতো থাকে তাকে ‘পুষ্টি আহার’ বলে। এতে ছয়টি খাদ্য উপাদান থাকে। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় আমাদের ছয়টি খাদ্য উপাদানই থাকা প্রয়োজন। মাঝারি শ্রম বিবেচনায় সুষম আহারের জন্য ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী  ছেলেমেয়ের জন্য প্রতিদিন শস্য জাতীয় (চাল ও আটা) ২৫০-৪০০ গ্রাম, ডাল ৩০ থেকে ৫০ গ্রাম, সবুজ শাক ১০০ গ্রাম, অন্যান্য সবজি ১০০ গ্রাম, মাছ-মাংস ১১০ থেকে ১২০ গ্রাম, ডিম ১টি, দুধ-দুগ্ধজাত খাদ্য ১৫০ থেকে ২০০ গ্রাম, তেল-ঘি-মাখন ৩০ থেকে ৪০ গ্রাম, বাদাম ৫০ থেকে ১০০ গ্রাম, ফল ৮০ থেকে ১০০ গ্রাম, পানি ৬ থেকে ৭ গ্লাস, চিনি-গুড়-মিষ্টি ৪০ থেকে ৫০ গ্রাম খাদ্য গ্রহণ করা প্রয়োজন। অপরদিকে ২০ থেকে ২৯ বছর বয়স্ক ৫০ থেকে ৬০ কেজি ওজনের মানুষের জন্য প্রতিদিন শস্য জাতীয় (চাল ও আটা) ৪৫০ থেকে ৫০০ গ্রাম, ডাল ৫০ থেকে ৬০ গ্রাম, সবুজ শাক ১০০ গ্রাম, অন্যান্য সবজি ২০০ গ্রাম. মাছ/মাংস ৭০ থেকে ১০০ গ্রাম, তেল-ঘি-মাখন ৪০ গ্রাম, ফল ১৫০ থেকে ২০০ গ্রাম, পানি ৬-৭ গ্লাস, চিনি-গুড়-মিষ্টি ৩০ গ্রাম খাদ্য গ্রহণ করা প্রয়োজন।
 
স্বাধীনতা লাভের পর বিগত ৪ দশকে বাংলাদেশের দানাদার খাদ্যশস্যের উৎপাদন তিনগুণ বেড়েছে। ওই সময়ে জনসংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণ। পুষ্টির বিচারে দৈনিক একজন মানুষের ৫০০ গ্রাম শর্করা জাতীয় খাদ্য গ্রহণের হিসেবে বাংলাদেশ শর্করা জাতীয় খাদ্য উৎপাদনে বর্তমানে স্বয়ংভর। তবে আমিষসহ অন্যান্য খাদ্য উৎপাদনে ঘাটতি রয়েছে। নানাবিধ উদ্যোগের ফলে এসব খাদ্যের ঘাটতি কমে আসছে। খাদ্য-নিরাপত্তা এবং পুষ্টি পরিস্থিতি-২০১২ এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের খাদ্য-নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে মূলত খাদ্য অপচয ও খাদ্য প্রাপ্তির অসমতার কারণে দেশের এখনও শতকরা ৩৭ ভাগ শিশু অপুষ্টির শিকার। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা ইনিস্টিটিউটের সূত্র মতে, দেশের শতকরা ২৫ ভাগ মানুষ নিয়মিত খাদ্য সংকটে পড়ে। অথচ বাংলাদেশের মানুষের রাষ্ট্রীয়ভাবে গড়ে মাথাপিছু খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ ২২৫০ কিলোক্যালরি যা গড়ে একজন মানুষের দৈনিক চাহিদার কাছাকাছি। এ থেকে দেশে খাদ্য অপচয় ও খাদ্য গ্রহণের অসমতার চিত্রটি ফুটে ওঠে।
 
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও খাদ্যের অপচয় মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) মহাপরিচালক হোসে গ্রাজিয়ানো দা সিলভা ২০১২ সনে বলেন, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ১৩০ কোটি টন খাদ্যের অপচয় হচ্ছে এবং অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে ১০০ কোটি মানুষ স্থূলকায় হয়ে পড়েছে। অথচ বিশ্বে ক্ষুধার্ত ও পুষ্টিহীন মানুষের সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৩০০ কোটি। যুক্তরাষ্ট্রের মাথাপিছু ৩৭৭০ কিলোক্যালরি ভোগের বিপরীতে ইরিত্রিয়ার মাথাপিছু ভোগ মাত্র ১৫৯০ কিলোক্যালরি। একদিকে ক্ষুধার্ত মানুষের মিছিল অপরদিকে অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে মুটিয়ে যাওয়া। বর্তমানে বিশ্বে যে পরিমাণ খাদ্য উৎপাদিত হয় তাতে পৃথিবীর ৭০০ কোটি মানুষের মাঝে সমানভাগে ভাগ করে দিলে প্রত্যেকে পায় ২৭২০ কিলোক্যালরি যা একজন মানুষের প্রয়োজনীয় ক্যালরির জন্য যথেষ্ট। খাদ্য অপচয় রোধ করতে পারলে বিশ্বে ক্ষুধার্ত মানুষ থাকবে না। বিশ্বে খাদ্যের দাম কমে আসবে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সম্পদের ওপর চাপ হ্রাস পাবে।    
 
বিগত সময়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি খাদ্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাধা হয়নি। কারণ গত ৩০ বছরে বিশ্বের জনসংখ্যা ৭০% বৃদ্ধির বিপরীতে গড় মাথাপিছু খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণ ১৭% বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বাস্তবে খাদ্যের অপচয় ও খাদ্য প্রাপ্তির অসম চিত্র ক্ষুধা ও পুষ্টিহীনতার প্রধান কারণ। ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী ও পুষ্টির অভাব দূরীকরণের জন্য কিছু সুপারিশ হলো- ১. ধনী দেশগুলোর অতিরিক্ত খাদ্যভোগের মানসিকতা বর্জন করা, ২. সুষম আহার উপযোগী খাদ্য উৎপাদন করা, ৩. খাদ্য গ্রহণের সময় সুষম আহারের দিকে লক্ষ রাখা, ৪. অতিরিক্ত খাদ্য মজুদ না করা, ৫. বিশ্বব্যাপী দক্ষ বাজার ও বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ৬. দরিদ্রতা দূরীকরণে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা, ৭. খাদ্যকে জৈব জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার না করা ৮. মানুষের প্রতি মানবিক আচরণ করা। সুনির্দিষ্ট কর্মকৌশলের মাধ্যমে লক্ষ্যগুলো অর্জন করা সম্ভব হবে। এতে অপচয় রোধের পাশাপাশি অর্ধহারী মানুষদের প্রয়োজনীয় খাদ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে। নিশ্চিত হবে সুখী, সমৃদ্ধশালী ও ঐক্যবদ্ধ এক পৃথিবী। পরিশেষে আমাদের হৃদয়ে যেন সদা সর্বদা জাগ্রত থাকে, ‘সকলের তরে সকলে আমরা/ প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।’
 
মোহাম্মদ মাহবুব-এ-খোদা*
*সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ, রাজশাহী। মোবাইল : ০১৭১২৫০৬৬৬৫, ইমেইল :mahbubekhoda67@gmail.com

Share with :

Facebook Facebook