কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

বাংলাদেশের মাটি পরিবেশ ও কৃষি খাদ্য নিরাপত্তার নিয়ামক

একটি গানের দুটি লাইন দিয়ে লেখাটি শুরু করতে চাচ্ছি- ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদেরই বসুন্ধরা, তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা, সে যে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে যে স্মৃতি দিয়ে ঘেরা, এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।’ সত্যিই, এত সুন্দর মাটি, জলবায়ু ও পরিবেশ পৃথিবীর আর কোথাও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বাংলাদেশের মাটি, খাঁটি সোনার চেয়েও খাঁটি। কোনো বীজ যদি এ মাটির সংস্পর্শে আসতে পারে তা থেকে কম বেশি ফলন পাওয়া যাবেই। প্রয়োজনমতো পরিচর্যা ও ফসলের জাত যদি ভালো হয় তাহলে তো কথাই নেই। ভূমণ্ডলীয় অবস্থানগত কারণেই বাংলাদেশের জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ। অপরদিকে গাঙ্গেয় বদ্বীপ হওয়ার কারণে এর মাটি খুবই উর্বর। তবে এ উর্বরতা দিনে দিনে কমতে শুরু করেছে। মাটিতে যে পরিমাণ জৈবপদার্থ থাকা দরকার নিবিড় চাষাবাদের ফলে তা দিন দিন কমে যাচ্ছে। কৃষি বাংলাদেশের একটি অন্যতম অর্থনৈতিক খাত। এ দেশের জিডিপির প্রায় ২২% আসে কৃষি খাত থেকে। কর্মসংস্থান ও খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে কৃষির অবদান অনস্বীকার্য। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সবুজ বিপ্লবের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার সম্প্রসারণ, কৃষিতে ভর্তুকি এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশ এগিয়ে যেতে থাকে। উল্লেখযোগ্য, সফলতাও আসতে থাকে এ খাতে। স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ে ১০ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য উৎপাদনের বিপরীতে এখন উৎপাদন প্রায় তিন গুণেরও বেশি। দানাশস্য উৎপাদনে দেশ প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও সর্বস্তরের জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা প্রদান নানা কারণে সম্ভব হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, বাজারদর মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকা, খাদ্যের সুষম বণ্টন ইত্যাদি যেমন জরুরি তেমনি সর্বস্তরের জনগণের সচেতনতার ওপর খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা অনেকটা নির্ভরশীল। কেবলমাত্র ধান বা দানাশস্যভিত্তিক খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন একটি দুরূহ ব্যাপার। উচ্চমূল্যের ফসলসহ শস্য বহুমুখীকরণের দিকে নজর দিতে হবে ও উৎপাদিত শস্য সঠিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে। একজন মানুষের খাদ্যাভ্যাসের সাথে তার খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। পেট ভর্তি ভাত কিংবা রুটি খেতে সমর্থ একজন লোককে খাদ্য ও পুষ্টির দিক থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যায় না। একজন শিশু বা প্রাপ্ত বয়স্ক লোকের সুস্থ সবল দেহ নিশ্চিত করার জন্য দৈনন্দিন যে পরিমাণ পুষ্টি সংবলিত আহার প্রয়োজন, খাদ্য তালিকায় তা অন্তর্ভুক্ত থাকা বাঞ্চনীয়। প্রচুর খাবার সরবরাহ থাকলেই খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপদ পরিস্থিতি বলা যায় না। ওই খাবার আহারোপযোগী এবং মানুষের ক্রমক্ষমতার মধ্যে থাকতে হবে।
 
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করণীয়
১. খাবারের অপচয় রোধ : UNEP Ges World Resources Institute এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বের মোট উৎপাদিত খাদ্যশস্যের এক তৃতীয়াংশ উৎপাদন এবং ভোক্তাপর্যায়ে অপচয় হয় যার মূল্যমান ১ ট্রিলিয়ন ডলার। ক্যালরি মূল্যমানে তা রূপান্তরিত করলে প্রতি ক্যালরির এক-চতুর্থাংশ খাদ্য অপচয় হয়। বাংলাদেশও এর আওতাভুক্ত। আমাদের দেশে বিভিন্ন পরিবারে বিভিন্নভাবে খাবারের অপচয় হয়ে থাকে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ও উৎসব আয়োজনে, সঠিক হিসাবে খাবার প্রস্তুত ও বিতরণ সম্ভব হলে বার্ষিক কয়েক লাখ টন খাদ্য মজুদ বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। সচেতনতার অভাবে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য পোকায় নষ্ট করে অথবা ইঁদুরের পেটে যায়। সঠিক প্রযুক্তিতে খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণ করা হলে ওই খাদ্যদ্রব্য দেশের খাদ্য মজুদ পরিস্থিতি বৃদ্ধি করে খাদ্য নিরাপাত্তায় ভূমিকা রাখতে পারে।
 
২. চাষাবাদে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার : কৃষক ভাইদের বিভিন্ন ফসল চাষাবাদের সময় ফসলের জাত বাছাই থেকে শুরু করে সময়মতো বীজ বপন, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, সময়মতো সেচ ও নিকাশ ইত্যাদি বিষয়ের ওপর বিশেষ নজর দিতে হবে। ফসলের রোপণ থেকে শুরু করে শস্যকর্তন, সংগ্রহ ও সংরক্ষণ পর্যন্ত গবেষণালব্ধ উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেষ্ট হলে হেক্টরপ্রতি ১৫-২০% উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব হবে। ওই বাড়তি উৎপাদন দেশের খাদ্য মজুদ বৃদ্ধি বা খাদ্য নিরাপত্তায় সম্পূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমানে শিক্ষার হার বৃদ্ধির সাথে সাথে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে কিন্তু কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় যান্ত্রিক চাষাবাদের দিকে আমাদের নজর দিতে হবে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উদ্ভাবিত কৃষি যন্ত্রপাতি যেমন প্লান্টার, হারভেস্টার, থ্রেশার ইত্যাদি ব্যবহারের মাধ্যমে ফসলের সময়মতো বপন, রোপণ পরিচর্যা ও কর্তন নিশ্চিত করতে পারলে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় অবদান রাখা সম্ভব হবে। পরিবেশসম্মত চাষাবাদের দিকেও আমাদের নজর দিতে হবে। ফসল উৎপাদনে জৈবসারের ব্যবহার, রোগ ও পোকার হাত থেকে ফসলকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে আইপিএম পদ্ধতি ব্যবহারে আমাদের মনোযোগী হতে হবে।

৩. শস্য বহুমুখীকরণ : বর্তমানে শস্যের জাতীয় গড় নিবিড়তা ১৯০%। অর্থাৎ দেশের ফসলি জমিতে বছরে দুটিরও কম ফসল ফলে। স্বল্পমেয়াদি ফসলের নিবিড় চাষাবাদের দিকে নজর দিলে এর নিবিড়তা ২০০% এরও বেশি উন্নীত করা সম্ভব হতে পারে। সারা বছর অথবা ফসল উৎপাদন মৌসুমে কৃষকের জমিতে এক ধরনের ফসল চাষ না করে বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ করে আয় বৃদ্ধি করা যেতে পারে। সব সময় একটি শস্য চাষ লাভজনক না-ও হতে পারে। কোনো মৌসুমে একটি জমি থেকে একটি শস্যের আশায় দীর্ঘদিন বসে না থেকে, ওই জমি থেকে মিশ্র ফসল, আন্তঃফসল অথবা পর্যায়ক্রমিক ফসল হিসেবে অতিরিক্ত এক বা একাধিক ফসল তুলে নেয়াকে আমরা শস্য বহুমুখীকরণ বলতে পারি। একজন কৃষক তার জমির শ্রেণীভেদে শস্য বহুমুখীকরণের বিভিন্ন পরিকল্পনা নিতে পারেন যেমন ধান ক্ষেতের আলে সবজি চাষ, আমন মৌসুমে ধানের সাথে ক্রমিক ফসল হিসেবে ডালজাতীয় ফসল, বিনা চাষে আলু, বিনা চাষে রসুন, সরিষা ছায়াযুক্ত স্থান বা ফল বাগানে আদা হলুদের চাষ, আলু, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি ইত্যাদি ফসলের সাথে স্বল্পমেয়াদি আন্তঃফসল লালশাক, ধনেপাতা ইত্যাদির চাষ। বাড়ির আঙিনায় বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি ও ফলমূলের চাষ। আখক্ষেতে শাকসবজি ডাল ও তেলজাতীয় আন্তঃফসল চাষ। মোট কথা নিজের খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিকভাবে নিজে এবং দেশকে লাভবান করার পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে কৃষকরা স্বাবলম্বী হতে পারেন।
৪. উন্নত পদ্ধতিতে সংরক্ষণ : খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের একটি প্রধান উপাদান হলো উৎপাদিত খাদ্যপণ্য উন্নত পদ্ধতিতে সংরক্ষণ। কৃষি পণ্যের উপযুক্ত বাজারমূল্য প্রাপ্তির জন্য সঠিক তাপমাত্রায় ভালোভাবে শুকিয়ে তা উপযুক্তস্থানে বা পাত্রে সংরক্ষণ করা বাঞ্ছনীয়। যেমন- ধানের বেলায় শতকরা জলীয় অংশের পরিমাণ থাকবে ১০-১২%, ডাল, তেল ও পেঁয়াজ ইত্যাদির বেলায় তা ভিন্ন। সঠিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণের মাধ্যমে পণ্যের অপচয় যেমন কম হয় তেমনি ভালো বাজারমূল্য নিশ্চিত হওয়ার কারণে খাদ্য নিরাপত্তায় ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে।

 
ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষ তাদের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন ঘটিয়ে যেমন সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হচ্ছে, তেমনি প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য সাশ্রয় করে রফতানির মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। উন্নত পদ্ধতিতে শস্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও শস্য বহুমুখীকরণের মাধ্যমে আমরা আমদানি নির্ভরতা কাটিয়ে রফতানিমুখী হতে পারি। এরই মধ্যে শ্রীলঙ্কায় চাল রফতানির মাধ্যমে আমরা এর শুভসূচনা করতে পেরেছি। এ ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের কৃষি ও কৃষকবান্ধব নীতি প্রশংসার দাবিদার। মাটির উর্বরতা সংরক্ষণের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে পরিবেশসম্মত চাষাবাদের ওপর মনোযোগী হলে আমরা আরও এগিয়ে যাব এবং এদেশ হবে সত্যিকারের সোনার বাংলা। আমরা হয়ে উঠব স্বয়ংসম্পূর্ণ সমৃদ্ধ জাতি।
 
লেখক:
মোহাম্মদ মহসীন*
* প্রকল্প লিয়াজোঁ অফিসার, খাদ্য নিরাপত্তা ময়মনসিংহ-শেরপুর প্রকল্প, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা

Share with :

Facebook Facebook