কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

মৃদু লবণাক্ততা সহনশীল দেশি ও তোষা পাট

মৃদু লবণাক্ততা সহনশীল দেশি ও তোষা পাটের দুইটি নতুন জাতের বৈশিষ্ট্য ও উৎপাদন পদ্ধতি
পাট বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশবান্ধব আঁশ ফসল। বাংলাদেশে সাধারণত দুই প্রজাতির পাট চাষ করা হয়। যেমন- দেশি ও তোষা। সব অর্থকরী ফসলগুলোর মধ্যে পাটের অবস্থান এখনও ভালো। পৃথিবীর অন্য পাট উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের পাটের মান ভালো এবং বর্তমানে উৎপাদনের বিবেচনায় ভারতের পরে দ্বিতীয় স্থানে আছে বাংলাদেশের পাটের অবস্থান। বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১৫.৯ লাখ টন পাট আঁশ উৎপন্ন হয় যার শতকরা ৫১ ভাগ ভারি পাটকলগুলোতে ব্যবহৃত হয়, ৪৪ ভাগ কাঁচা পাট বিদেশে রপ্তানি হয় ও মাত্র ৫ ভাগ দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারে কাজে লাগে। গত ৭০ বা ৮০ দশকের তুলনায় বাংলাদেশে পাটের আবাদের জমি কমে গেলেও গত ৩ থেকে ৪ বছরে এর একটি বৃদ্ধি লক্ষ করা যাচ্ছে। বর্তমানে পরিবেশগত কারণে পাটের চাহিদার বৃদ্ধি ও সাথে সাথে উৎপাদন বৃদ্ধির একটা সম্ভাবনা প্রায়ই লক্ষ করা যায়। পাট  গবেষণার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কৃষি বিজ্ঞানীদের নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে একটি ধবধবে সাদাসহ এ পর্যন্ত ৪৩টি উচ্চফলনশীল পাট, কেনাফ ও মেস্তা ফসলের জাতের উদ্ভাবন ঘটানো সম্ভব হয়েছে। দেশি ও তোষা পাটের জীবন রহস্য আবিষ্কার এবং পাটের কা- পচা রোগ প্রতিরোধী পাটজাত উদ্ভাবনের নিমিত্তে পাটসহ বিশ্বের পাঁচ  শতাধিক উদ্ভিদের জন্য ক্ষতিকারক ছত্রাক Macrophomina phaseolina এর জীবন রহস্য উন্মোচন করা হয়েছে। উদ্ভাবিত এ তথ্যকে কাজে লাগিয়ে বর্তমানে কা-পচা রোগ প্রতিরোধী পাটজাত উদ্ভাবনের গবেষণা এগিয়ে চলছে। সম্প্রতি মৃদু লবণাক্ততা সহনশীল, কম সময়ে উৎপাদন সক্ষম ও উচ্চফলনশীল পাটের পৃথক দুইটি নতুন দেশি ও তোষা জাতের উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই)। এ জাতগুলোর বৈশিষ্ট্য ও উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে নিম্নে স্বল্পপরিসরে বর্ণনা দেয়া হলো-

দেশি পাটের নতুন জাত
বিজেআরআই দেশি পাট-৮ (দ্রুতি) (বিজেসি-২১৯৭)
বিজেআরআই কর্তৃক এ উন্নত দেশি পাটের জাতটি অকাল ফুল মুক্ত দীর্ঘ বপনকাল সম্পন্ন দেশি জাত সিসি-৪৫ এর সাথে দ্রুতবর্ধনশীল লাইন ফরমোজা ডিপ রেডের (এফডিআর) সংকরায়ণের মাধ্যমে উদ্ভাবন করা হয় এবং জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক ২০১৩ সালে অনুমোদন পায়। বিজেআরআই দেশি পাট-৮ যা মৃদু লবণাক্ততা সহনশীল, আগাম পরিপক্ব (দ্রুতবর্ধনশীল), মোজাইক রোগ সহিষ্ণু ও উচ্চফলনশীল। এর কা- হালকা লাল এবং আঁশের মান খুবই ভালো। এ জাতটি দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত এলাকায় সফলভাবে চাষ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়, ফলে খাদ্যশস্য উৎপাদনক্ষম জমির সাথে প্রতিযোগিতা কমিয়ে নতুন নতুন এলাকায় পাটকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। তাছাড়া এ জাতটি বাংলাদেশের সমগ্র অঞ্চলে চাষ উপযোগী বলে প্রমাণিত হয়েছে। পাতা দীর্ঘ বল্লমাকৃতির। স্বল্পমেয়াদি জাত, কা- হাল্কা লাল, পাতার বোঁটার উপরিভাগ উজ্জ্বল তামাটে লাল রঙ, নিম্ন ভাগে বোঁটা ও ফলকের সংযোগ স্থানে আংটির মতো গাঢ় লাল রঙের গোল দাগ আছে।  তাছাড়া জাতটিতে রোগবালাই কম, সে কারণে চাষিদের খরচও কম হবে। তিন ফসলি শস্যক্রমের জন্য খুব উপযোগী। সঠিক সময়ে বপন করা হলে গাছের উচ্চতা ৩.২ থেকে ৩.৮ মিটার এবং গোড়ার ব্যাস ১৮ মিমি. পর্যন্ত হয়ে থাকে। চৈত্রের মাঝামাঝি থেকে বৈশাখের ২য় সপ্তাহ পর্যন্ত এর বপন সময়। বীজ হার ৭-৮ কেজি/হেক্টর। এ জাতের পাট ১১৫ দিনে কাটা যায়। সর্বোচ্চ ফলন ক্ষতমা ৪.৫০ টন/হেক্টর। কৃষকের জমিতে  গড়ে ৩.০০ টন/হেক্টর ফলন পাওয়া যায়।

তোষা বা বগী পাটের নতুন জাত
বিজেআরআই তোষা পাট-৬ (ও-৩৮২০)  
বিজেআরআই কর্তৃক এ উন্নত তোষা পাটের জাতটি এনাটমিক্যালি বাছাইকৃত উন্নত লাইনগুলো থেকে বিশুদ্ধ নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ লাইনটি উদ্ভাবন করা হয় এবং জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক ২০১৩ সালে অনুমোদন পায়। এ জাতটি বাংলাদেশের সমগ্র অঞ্চলে চাষ উপযোগী বলে প্রমাণিত হয়েছে। এ জাতটির ছালে পুরুত্ব বেশি এবং পাটকাঠি তুলনামূলক শক্ত। গাছ লম্বা, কাণ্ড গাঢ় সবুজ মসৃণ এবং দ্রুতবর্ধনশীল। বীজের রঙ নীলাভ সবুজ। পাতা লম্বা ও লেনসিওলেট টাইপ। পাতার দৈর্ঘ্য প্রস্থের অনুপাত ২.৬৬:১ যা অন্যাান্য তোষা জাত অপেক্ষা বেশি। সঠিক সময়ে বপন করা হলে গাছের উচ্চতা ৩.৭ থেকে ৪.০ মিটার এবং গোড়ার ব্যাস ২২ মিমি পর্যন্ত হয়ে থাকে। বপনের উপযুক্ত সময় চৈত্র এর ২য় সপ্তাহ- বৈশাখ এর ২য় সপ্তাহ (এপ্রিল ১ম সপ্তাহ থেকে এপ্রিল শেষ সপ্তাহ)। বীজ হার ৫-৬ কেজি/হেক্টর। এ জাতটিও আগাম পরিপক্ব (দ্রুতবর্ধনশীল) ও উচ্চফলনশীল। আঁশের মান ভালো এবং রঙ উজ্জ্বল সোনালি। এ জাতটি নাবীতে বা দেরিতে বপন করেও মাত্র ১০০-১১০ দিন বয়সে কাটা যাবে। এটি আগাগোড়া প্রায় একই রকম এবং লম্বায় ৪-৫ মিটার হয়ে থাকে। আগের প্রচলিত জাত ও-৪ বা ভারতীয় যে কোনো জাতের তুলনায় ৭-৮ শতাংশ ফলন বেশি পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তাছাড়া জাতটিতে রোগবালাই কম, সে কারণে চাষিদের খরচও কম হবে। প্রতি হেক্টর জমিতে এ জাতের ফলন প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন টন অর্থাৎ বিঘাতে প্রায় সাড়ে ১২ মন। যেহেতু মাত্র ১০০ থেকে ১১০ দিনে তোষা জাতটি কাটা যাবে সে হিসেবে একই জমিতে তিনটি ফসল ফলানো যাবে অতি সহজে। সর্বোচ্চ ফলন ক্ষমতা ৫.০০ টন/হেক্টর। হেক্টরপ্রতি গাছের সংখ্যা ৩.৫ থেকে ৪.০ লক্ষ রাখা গেলে কৃষকের জমিতে  গড়ে ৩.০০ টন/হেক্টর ফলন পাওয়া যায়। এ জাত দু’টির বীজ উৎপাদনে বিএডিসি ইতোমধ্যেই কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। আমরা আশা করি আগামী বছর থেকেই কৃষক পর্যায়ে চাষাবাদ সম্ভব হবে।

পাট (দেশি /তোষা) উৎপাদন ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি
বীজ নির্বাচন
উফশী জাতের বীজ নামে হলেই হবে না, বীজের মান ঠিক থাকতে হবে। ভালো এবং অধিক ফসল পেতে হলে রোগমুক্ত, পরিষ্কার ও পরিপুষ্ট বীজ ব্যবহার করা উচিত। বীজের অংকুরোদগম হার (৮০%) এবং মান ঠিক না থাকলে প্রচলিত ধ্যান-ধারণার আলোকে কেউ কেউ অধিক পরিমাণ বীজ বপন করে ওই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে থাকেন। কিন্তু মান সম্পন্ন বীজ ব্যবহার না করে অধিক নিম্নমানের বীজ বপন করেও পর্যাপ্ত গাছ পাওয়া যায় না। অধিকন্তু নিম্নমানের বীজ থেকে রোগ সহজেই অন্য চারাগাছ আক্রমণ করে ফসলের ক্ষতি করতে পারে।

জমি নির্বাচন
দো-আঁশ এবং বেলে দো-আঁশ ধরনের মাটি বিশিষ্ট যে কোনো জমিতে পাট ভালো হয়। যেসব জমি ঋতুর প্রথমে বৃষ্টির পানিতে ডুবে যায় না এবং বৃষ্টির পানি সরে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে এমন জমি নির্বাচন করতে হয়। তাছাড়া বাগানের আশপাশে বা বসতবাড়ির পাশের জমিতে পাট ভালো হয় না। তাই পাটের জন্য একটু উঁচু বা মধ্যম উঁচু জমি নির্বাচন করা প্রয়োজন।

জমি তৈরি
পাটের বীজ খুব ছোট বলে পাট ফসলের জমি মিহি করে চাষ দিতে হয়। পাট গাছ চারমাস ব্যাপী বৃদ্ধি পায় এবং ৩ থেকে ৫ মিটার উঁচু হয় বলে এব জন্য জমি গভীর করে চাষ দেয়া প্রয়োজন। পাট চোষের জন্য খরচ কমাতে হলে যেসব জমিতে আলু বা সবজি করা হয় সেসব জমিতে একবার চাষ করে মই দিয়ে পাট বীজ বপন করেও ভালো ফসল পাওয়া সম্ভব হয়েছে।

সার প্রয়োগ
যে কোনো ফসলের মতো পাট ফসলেও যথোপযুক্ত সার পরিমিত মাত্রায় উপযুক্ত সময়ে প্রয়োগ করে আঁশের ফলন ও মান যথেষ্ট বাড়ানো সম্ভব। পাট গাছের দৈহিক বৃদ্ধি এবং অাঁশফলন বাড়ানোর ক্ষেত্রে নাইট্রোজেন হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌল। ফসফরাস ও পটাসিয়ামের ভূমিকা নাইট্রোজেনের মতো নাটকীয় না হলেও এদের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ফসফরাস ভূশয়ান অবস্থাকে প্রতিরোধ করে, আঁশের মান উন্নত করে এবং নাইট্রোজেন সদ্ব্যবহারের উপযুক্ততাকে বাড়িয়ে দেয়। আরও লক্ষ করা গেছে যে, ফসফেট (টিএসপি হিসেবে) এবং পটাশ (মিউরেট অব পটাশ হিসেবে) সারের একবার প্রয়োগ এবং নাইট্রোজেন দুইবার পৃথক প্রয়োগ পাট চাষের জন্য যথেষ্ট অর্থকরী এবং সাফল্যজনক। বাংলাদেশের অনেক পাট চাষের জমি সালফার এবং জিঙ্ক ন্যূনতায় রয়েছে। সেসব জমিতে সালফার ও জিঙ্ক প্রয়োগ করে ফল পাওয়া যায়।

প্রকৃত পক্ষে স্থান ভিত্তিক জমির উবর্বতা শক্তি এবং কোনো কোনো মৌলের অধিক প্রয়োজন তা বিশ্লেষণ করে সার ব্যবহারের মাত্রা নির্ধারণ করাটা বিজ্ঞান সম্মত। কিন্তু কৃষক পর্যায়ে অথবা আঞ্চলিক কেন্দ্র সমূহ পর্যায়ে কোন মাটি বিশ্লেষণকারী সুযোগ-সুবিধাদি না থাকায় বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট বিভিন্ন অঞ্চলের মাটি পরীক্ষা করে এবং আঞ্চলিক কেন্দ্র সমূহে পরীক্ষণ স্থাপন করে, বিশ্লেষণের মাধ্যমে পাট চাষের জমির জন্য একটি সাধারণ সার মাত্রা অনুমোদন করেছে (সারণি-১)।

সার প্রয়োগ পদ্ধতি
গোবর সার অবশ্যই বীজ বপনের ২ থেকে ৩ সপ্তাহ পূর্বে জমিতে প্রয়োগ করতে হবে
প্রয়োগকৃত গোবর সার চাষ ও মই দিয়ে মাটির সাথে ভালো করে মিশিয়ে দিতে হবে।

বীজ বপনের দিন প্রয়োজনীয় পরিমাণের ইউরিয়া, টিএসপি, এমপি, জিপসাম এবং জিংক সালফেট সার জমিতে শেষ চাষে প্রয়োগ করে মই দিয়ে মাটির সাথে ভাব করে মিশিয়ে দিতে হবে।

দ্বিতীয় কিস্তি (৪৫ দিনে) ইউরিয়া সার প্রয়োগের সময় লক্ষ রাখতে হবে যেন মাটিতে পর্যপ্ত পরিমাণ রস থাকে।

দ্বিতীয় কিস্তি প্রয়োজনীয় পরিমাণের ইউরিয়া সার কিছু শুকনা মাটির সাথে মিশিয়েজমিতে প্রয়োগ করা ভালো।

প্রয়োগকৃত ইউরিয়া সার হো যন্ত্রের সাহায্যে অথবা প্রচলিত নিড়ানির সাহাযো ভালো করে জমিতে মিশিয়ে দিতে হবে।

ইউরিয়া সার প্রয়োগের সময় লক্ষ রাখতে হবে যেন প্রয়োগকৃত সার গাছের কচি পাতায় এবং ডগায় না লাগে।

বীজের পরিমাণ ও গাছের ঘনত্ব  
প্রচলিত এবং জনপ্রিয় পদ্ধতি হচেছ ছিটিয়ে বপন করা। বীজের অভাব না হলে অধিক পরিমাণে বীজ বপন করা একটা অভ্যাসের ফল। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট-এ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। অধিক (প্রায় ১০০%) জীয়তা— এবং সতেজতা সম্পন্ন বীজ সরবরাহ করার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করা যায়।

পাটের অধিকাংশ জমি এখনও ছিটিয়ে বপন করা হয়। এতে জমিজুড়ে গাছের ঘনত্ব সর্বত্র সমান থাকে না, ফলে কোন গাছ মোটা, কোন গাছ সরু ইত্যাদি বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। পাট কাটার আগে একরে ৮০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ বা হেক্টরে ১,৯০,০০০ থেকে ২,৪০,০০০টি গাছ রাখা নির্ধারিত থাকলেও একরে ৭৫,০০০ বা হেক্টরে ১,৮০,০০০ এর অধিক গাছ থাকে না। ফলে ফলনও আশানুরূপ হয় না। সারিতে বপন করা আপাতদৃষ্টে কষ্টসাধ্য মনে হলেও এর উপকারিতা সম্পর্কে অনেকেই জ্ঞাত নন। প্রথমত এর ফলে জমির সর্বত্র গাছের বিস্তৃত সমভাবে থাকে। ফলে সরু/মোটা গাছের সমস্যা কম হয়। দ্বিতীয়ত পরিচর্যার সুবিধা হয়। সারিতে বপন করা হলে বীজের পরিমাণ কম লাগে এবং গজায়ও ভালো। এর ফলে নির্ধারিত সংখ্যক গাছ থাকে। সারি থেকে সারির দূরত্ব নিয়ে গবেষণা করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে ৩০ সেন্টিমিটার দূরে দূরে সারি করে বীজ বপন করলে সবচেয়ে ভালো হয়। গাছ থেকে গাছের দূরত্ব সব সময় ঠিক রাখা না গেলেও পরিমিত অবস্থায় তা ৭ থেকে ১০ সেন্টিমিটার ধরা হয়। সারিতে বীজ বপন করার জন্য বীজ বপন যন্ত্র বা সিডার ব্যবহার লাভজনক।

নিড়ানি ও পাতলাকরণ
বাংলাদেশের পাট ক্ষেতে ৩৯টি গোত্রের অন্তর্গত ৯৯টি গণ এর ১২৯টি প্রজাতির উদ্ভিদ আগাছা হিসেবে জন্মে। এদের মধ্যে ২৭টি প্রজাতি আগাছা হিসেবে খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং এক বীজপত্রী মাত্র ৭টি প্রজাতি ফসলের সর্বোচচ ক্ষতিসাধন করে। এদের ঘনত্ব প্রতি ৩ বর্গ ফুটে ৫ থেকে ১০২টি আগাছা হতে পারে। পাটের আবাদে যে খরচ হয় তার একটা বড় অংশই নিড়ানি ও পরিচর্যার জন্য হয়ে থাকে। সেদিক দিয়ে জমি নির্বাচন খুব গুরুত্বপূর্ণ। ফসলক্রম করেও আগাছা অনেক দমন করা যায় যেমন, আলু ক্ষেতে পাট বপন করা হলে চাষাবাদ এবং নিড়ানি দুটোর খরচই প্রায় বেঁচে যায়।  চারা গজানোর ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে চারা পাতলা করা প্রয়োজন। কেননা তা না হলে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতার চাপে কোন চারাই বৃদ্ধি পেতে পারে না। সারিতে বপন করা হলে হাত দিয়ে বা ছিটিয়ে বপন করা হয়ে থাকলে আঁচড়া দিয়ে প্রাথমিকভাবে চারা পাতলা করা যায়। পাট গাছের বয়সের ৪০ থেকে ৫০ দিনের মধ্যে একবার নিড়ানি দেয়ার সময় কৃষকগণ কোন কোন ক্ষেতে চারা ও পাতলা করে থাকেন। তবে বয়সের ৬০ থেকে ৭০ দিনের মধ্যে যে চারা পাতলা করা হয় তা টানা বাছ নামে এবং বয়সের ৮৫ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে চারার গোড়া কেটে যে পাতলা করা হয় তা কাটা বাছ নামে পরিচিত। এ কচি গাছ না ফেলে পচিয়ে খুব উন্নত মানের পাট পাওয়া যায়, যা সূক্ষ্ম সুতা তৈরি করায় ব্যবহ্নত হতে পারে। এই দু বা তিনটি বাছ বা নিড়ানি দেয়ার জন্য কিন্তু অতিরিক্ত চারা রাখার দরকার নেই। কারণ কম হারে বীজ বপন করা হলে চারা কম গজাবে এবং পাতলাকরণের সময় কম চারা উঠালেই চলে। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, পাট গাছের প্রতিটি দিন বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই নিড়ানির ও পাতলাকরণে অবহেলা করলে গাছের বৃদ্ধির যে ক্ষতি হয় তা কোনভাবেই পূরণ হয় না। ফলে ফলন কমে যায়।

পানি নিষ্কাশন
পাটের জমিতে জমে থাকা পানি নিষ্কাশন অত্যন্ত জরুরি। জমিতে পানি জমলে মাটির ভিতর বাতাস প্রবেশ করতে পারে না ফলে গাছের শিকড়ের শ্বাস-প্রশ্বাস বিঘ্নিত হয়, গাছ স্বাভাবিকভাবে খাদ্য গ্রহণ করতে পারে না, ফলে গাছের দৈহিক বৃদ্ধি ঘটে না এবং শেষ পর্যন্ত গাছ মারা যেতে পারে। দেশি পাটের জাত চারা অবস্থায় পানি সহ্য ক্ষমতা থাকে না । তবে এ জাতের গাছের বয়স ও উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে। কিন্তু তোষা পাট চারা অবস্থায় পানি সহ্য করতে পারে না, এমনকি বড় হলেও দাঁড়ান পানি বা জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না।

ফসল কর্তন
বপনের ৬০ থেকে ১৪০ দিনের মধ্যে পাট ফসল কর্তন করা যায়, তবে আঁশের ফলন এবং মানের মধ্যে সমতা পেতে হলে ১০০ থেকে ১২০ দিনের মধ্যেই যে কোন জাতের পাট কাটার প্রকৃত সময়। সাধারণত পাট গাছে যখন ফুল আসা শুরু হয় তখন বা তার আগে প্রয়োজন মতো সুবিধাজনক সময় পাট ক্ষেত কাটা হয়। কৃষকগণ অনেক সময় ফলন বেশী  পাবার জন্য দেরীতে পাট গাছ কাটেন। পরীক্ষণের মাধ্যমে দেখা গিয়েছে যে, বপনের ৬০ থেকে ১০৫ দিনের মধ্যে কর্তনসূচক কম বেশি স্থিতিশীল  থাকে এবং ১২০ দিনের দিকে তা হঠাৎ অধিক বৃদ্ধি পায়। এ থেকে ধারণা করা যায় যে অধিকাংশ জাতেরই ১২০ দিনের পরও আঁশ ফলন বাড়ানোর প্রেক্ষিতে প্রয়োগকৃত পুষ্টি দ্রব্য সদ্ব্যবহারের সুযোগ আছে। কিন্তু গাছের বয়সের ৬০ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে সার প্রয়োগ করা হলে তা বৃদ্ধি এবং কর্তন সূচককে বাড়িয়ে ১২০ দিনে প্রমিত ফলন পেতে সহায়তা করে।
 
 
কৃষিবিদ ড. মো. মাহবুবুল ইসলাম*
* মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রধান, কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা-১২০৭ মোবাইল: ০১৫৫২-৪১৬৫৩৭, (Email: mahbub_agronomy@yahoo.com)

Share with :

Facebook Facebook