কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

ইঁদুর নিধন অভিযান

কৃষি আমাদের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন। জাতীয় আয়ের সিংহভাগ আসে কৃষি খাত থেকে। বর্তমান সরকার কৃষিবান্ধব সরকার। এই সরকারের প্রধান লক্ষ্য হলো কৃষি  ও কৃষকের উন্নয়ন এবং সব প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে এ দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। বীজ বপন থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত বিভিন্ন রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ এবং ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের প্রাদুর্ভাব পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে ফসল ঘরে তোলাই কৃষকের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু দেখা যায় কৃষকের উৎপাদিত ফসলের একটা বড় অংশ ইঁদুর দ্বারা নষ্ট হয়। ইঁদুর যে পরিমাণ খাবার খায় তার  চেয়ে বেশি কেটেকুটে নষ্ট করে। ক্রমবর্ধমান হারে বর্ধনশীল জনসংখ্যার খাদ্যের প্রয়োজন মেটাতে মাঠে একাধিক ফসলের চাষ হচ্ছে। এক হিসাবে দেখা গেছে প্রতি বছর ইঁদুরের কারণে ১০-১২ লক্ষ টন খাদ্যশস্য নষ্ট হয়ে থাকে। কারণ ইঁদুর প্রতিদিন তার শরীরের ওজনের ১০ গুণ পর্যন্ত খাবার নষ্ট করতে পারে। এ ছাড়া মলমূত্র ও লোম আমাদের খাদ্যদ্রব্যের সাথে মিশে টাইফয়েড, জন্ডিস, চর্মরোগ, কৃমিরোগসহ ৩৩ প্রকারের রোগ ছড়ায়। মারাত্মক প্লেগ রোগের বাহকও এই ইঁঁদুর। ইঁদুর মাঠের ও ঘরের ফসল নষ্ট করা ছাড়াও বৈদ্যুতিক তার কেটে অগ্নিকা- ঘটায়, টেলিফোনের তার কেটে টেলিফোন অচল করে দেয়, কম্পিউটারসহ ঘরের কাপড়-চোপড়, কাগজপত্র কেটে নষ্ট করে। এ ছাড়া রাস্তা, বাঁধ, রেললাইনে গর্ত করার ফলে বন্যার সময় পানি ঢুকে রাস্তা, বাঁধ ও রেললাইন ভেঙে যায়। ইঁদুর ঘরে ও মাঠে উভয় স্থানে ক্ষতি করলেও মাঠে এর ক্ষতির পরিমাণ বেশি। এক জরিপ অনুযায়ী আমন ধানের শতকরা ৫-৭ ভাগ, গমের শতকরা ৪-১২ ভাগ, গোল আলুর শতকরা ৫-৭ ভাগ, আনারসে শতকরা ৬ - ৯ ভাগ এবং সেচ নালার ৭-১০ভাগ পানি ইঁদুরের কারণে নষ্ট হয়ে থাকে। এজন্য কৃষকদের ফসলের মাঠে সময়মতো ইঁদুর দমনে উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রতি বছরই ইঁদুর নিধন কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজন রয়েছে।
 
ইঁদুর দ্রুত বংশবিস্তারকারী প্রাণী। কোন স্থানে এক জোড়া ইঁদুর থাকলেই এক বছরে ৩০০০টি বংশধরের সৃষ্টি করতে পারে। এজন্য ইঁদুর নিধন করা হলে প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ক্ষতি হবে না। কিন্তু ইঁদুর নিধন না হলে ফসল ও সম্পদের ক্ষতি বৃদ্ধি পাবে। বাংলাদেশে ইঁদুর নিধন অভিযান ১৯৮৩ সন থেকে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিটি অভিযানের কার্যক্রম বাস্তবায়ন বিশেষজ্ঞ দ্বারা মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে এবং এর ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী অভিযানের কার্যক্রম কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়ে থাকে।
 
ইঁদুর নিধন অভিযান পরিচালনার ফলে প্রতি বছর ইঁদুরের আক্রমণের হাত থেকে ফসল রক্ষার পরিমাণ বেড়েছে। ইঁদুর নিধন কার্যক্রমকে জোরদার করার ফলে ইঁদুরের আক্রমণের হাত থেকে ফসলের একটা বড় অংশ রক্ষা পাবে বলে আশা করা যায়।
 
ইঁদুর নিধন অভিযানের  উদ্দেশ্য
কৃষক, কৃষাণী, ছাত্রছাত্রী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আইপিএম/আইসিএম ক্লাবের সদস্য, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাসহ সর্বস্তরের জনগণকে ইদুর দমনে উদ্বুদ্ধ করা।
 
ইঁদুর দমনের লাগসই প্রযুক্তি কৃষিকর্মীগণের মাধ্যমে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছানো।
ঘরবাড়ি, দোকানপাট, শিল্পকারখানা ও হাঁস-মুরগির খামার ইঁদুরমুক্ত রাখার জন্য সর্বস্তরের জনগণকে উদ্বুদ্ধ  করা।
 
আমন ফসল ও অন্যান্য মাঠ ফসলে ইঁদুরের ক্ষতির পরিমাণ কম রাখা।
গভীর ও অগভীর নলকূপের সেচের নালার ইঁদুর মেরে পানির অপচয় রোধ করা।
রাস্তাঘাট ও বাঁধের ইঁদুর নিধনের জন্য সর্বস্তরের জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা।
ইঁদুরবাহিত রোগের বিস্তার রোধ করা এবং পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখা।
 
উপসংহার : ইঁদুরের সমস্যা দীর্ঘদিনের । এ সমস্যা পূর্বে যেমন ছিল, বর্তমানেও রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজন সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং অংশীদারিত্ব। কারণ ইঁদুর দমন পদ্ধতি পোকা ও রোগবালাই দমন পদ্ধতির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে বিষটোপ ও ফাঁদ লাজুকতার সমস্যা রয়েছে। সঠিক সময়ে সঠিক পদ্ধতি ও সঠিক  স্থানে দমন পদ্ধতি গ্রহণ না করা হলে দমন ব্যবস্থা ততটা কার্যকর হয় না। সেজন্য একা ইঁদুর মারলে দমন ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কারণ ইঁদুর সর্বদা খাদ্য ও বাসস্থানের জন্য স্থান পরিবর্তন করে থাকে।  এ জন্য পাড়া প্রতিবেশীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একই দিনে ও একই সময়ে ইুঁদর নিধন করা প্রয়োজন। ইঁদুর নিধন অভিযানের সফলতা নির্ভর করে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশ গ্রহণের ওপর। ইঁদুরকে একটা সামাজিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে এর সমাধান সামাজিকভাবেই করতে হবে, যাতে ইঁদুর দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির ধারায় কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে না পারে।
 
মো. আখতারুজ্জামান*
* পরিচালক, উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং, ডিএই, খামারবাড়ি, ঢাকা-১২১৫

Share with :

Facebook Facebook