কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

বাংলাদেশে তুলা চাষ সম্প্রসারণে চীনা প্রযুক্তির ব্যবহার

বস্ত্রশিল্প দেশের বেকার জনশক্তির কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখে আসছে এবং বস্ত্র শিল্পে বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখ (রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকসহ) শ্রমশক্তি নিয়োজিত রয়েছে। অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রে বস্ত্রশিল্প মোট শিল্প আয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ এবং জাতীয় আয়ের ১০ শতাংশ অবদান রেখে আসছে। বস্ত্র ও তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে ১৯৯৫-৯৬ সালে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পরিমাণ ছিল ২.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৩-১৪ সালে ২৫.৬১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দাঁড়িয়েছে; যা রপ্তানি খাতে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ। এ বস্ত্রশিল্পের মূল কাঁচামাল তুলা। প্রতি বছর প্রায় ৪০-৪২ লাখ বেল কাঁচাতুলার প্রয়োজন হয়- যার মূল্য আনুমানিক ১২,০০০ কোটি টাকা। দেশীয় উৎপাদন মাত্র ১,৫০,০০০ বেল যা জাতীয় চাহিদার ২-৩% মাত্র। বাংলাদেশে তুলা চাষের উপযোগী জমির পরিমাণ প্রায় ২.৫ লাখ হেক্টর। এ উপযোগী জমিতে উন্নত প্রযুক্তির প্রসার ঘটিয়ে জাতীয় চাহিদার ৩০% মেটানো সম্ভব। তুলা উন্নয়ন বোর্ড তুলা চাষ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এ দায়িত্ব পালন করে আসছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ৪টি রিজিয়ন, ১৩টি জোন, ১৮০টি ইউনিট ইউনিট অফিসের মাধ্যমে ৩৩টি সমতল জেলা এবং ৩টি পাহাড়ি জেলায় তুলা চাষ সম্প্রসারণের কাজ পরিচালিত হচ্ছে। তাছাড়া ৫টি গবেষণা খামারে মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন ও গবেষণা কার্যক্রম চলছে। বর্তমান সরকার বাংলাদেশে তুলা চাষ সম্প্রসারণ ও গবেষণার কথা বিবেচনা করে ৩টি কর্মসূচি ও ১টি প্রকল্প তুলা উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করছে। তাছাড়া অতি সম্প্রতি ১৯/০৮/২০১৪ তারিখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ১০৫ কোটি টাকার ‘সম্প্রসারিত তুলা চাষ, ফেজ-১’ শীর্ষক একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছেন যার মাধ্যমে ৪৬টি জেলায় ১ লাখ হেক্টর জমি তুলা চাষের আওতায় আনা হবে। তাছাড়া বর্তমান সরকারের সময়ে তুলা চাষের এলাকা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিম্নে ২০০৮-২০০৯ মৌসুম হতে ২০১৪-১৫ মৌসুমের তুলা চাষের অগ্রগতি দেখানো হলো (দ্বিতীয় পৃষ্ঠায়)।
 
তুলা চাষে বাংলাদেশে সম্ভাবনার মূল কারণ এর সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা। সরকার কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যে এর বাজারজাতকরণ হয় সমগ্র বাংলাদেশে। তাছাড়া তুলার রয়েছে বহুবিধ ব্যবহার-তুলা বীজ থেকে আঁশ ছাড়াও তৈল, খৈল ও জ্বালানি পাওয়া যায়। তুলা একটি গভীরমূলী ফসল হওয়ায় মাটির উর্বরতা রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের সম্প্রসারণ কার্যক্রমের মতো গবেষণা অংশটি ততটা শক্তিশালী নয়-তবে NARS এর আওতায় ২০১২ সনে আসার পর থেকে গবেষণা অংশ শক্তিশালী হতে চলেছে। এ পর্যন্ত গবেষণার মাধ্যমে ১৪টি সমতল ভূমির এবং ২টি পাহাড়ি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে, যার মধ্যে সিবি-১২, সিবি-১৩, সিবি-১৪ এবং এইচসি-২ ব্যপক সমাদৃত। তাছাড়া বেসরকারি বীজ কোম্পানির মাধ্যমে তুলা উন্নয়ন বোর্ড হাইব্রিড জাতের তুলা বীজ চাষি পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে এবং তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব উদ্যোগে হাইব্রিড জাত উদ্ভাবনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তাছাড়া বর্তমান সরকার অচিরেই ‘বিটি তুলা’ চাষি পর্যায়ে সম্প্রসারণের এর উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এত সম্ভাবনার মাঝে সীমাবদ্ধতা কিছু রয়েছে তুলা চাষ সম্প্রসারণ ও গবেষণায়। বিশেষ করে স্বল্পমেয়াদি জাত, অঙ্গজ শাখাবিহীন তুলার গাছ, উচ্চফলনশীল হাইব্রিড বিটি জনবল এবং জমির স্বল্পতা। বর্তমান তুলা উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে চীনের অবস্থান এক নম্বরে। চীন উৎপাদনকারী, আমদানিকারক এবং ব্যবহারকারী এ তিনটি বিষয়ে তাদের অবস্থান এক নম্বরে।
 
ক্রম উৎপাদন মৌসুম তুলার প্রকার তুলা চাষ (হেক্টর) আঁশতুলার উৎপাদন (বেল)
১. ২০০৮-০৯ সমভূমির তুলা ১৮৩২০ ৪৪৩৬৫
পাহাড়ি তুলা ১৪২৮০ ৫৮১০
মোট ৩২৬০০ ৫০১৭৫
২. ২০০৯-১০ সমভূমির তুলা       ১৭০৪০ ৬৪০০০
পাহাড়ি তুলা        ১৪৪৬০ ৬০০০
মোট        ৩১৫০০ ৭০০০০
৩. ২০১০-১১           সমভূমির তুলা ১৮২৩০ ৭৩৫০০
পাহাড়ি তুলা        ১৫২৭০ ৬৫০০
মোট       ৩৩৫০০ ৮০০০০
৪. ২০১১-১২            সমভূমির তুলা ২০০২৫ ৯৬৬২৪
পাহাড়ি তুলা       ১৫৬৫০ ৬৮০০
মোট        ৩৫৬৭৫ ১০৩৪২৪
৫. ২০১২-১৩        সমভূমির তুলা ২৪০০০    ১২১৩৬০
পাহাড়ি তুলা       ১৫৭৫৬  ৭৬৪০
মোট        ৩৯৭৫৬ ১২৯০০০
৬. ২০১৩-১৪           সমভূমির তুলা ২৪৮৫৫ ১৩৬৫৬৯
পাহাড়ি তুলা       ১৬৬৪৩ ৮০৪৭
 মোট       ৪১৪৯৮  ১৪৪৬১৬
৭. ২০১৪-১৫        সমভূমির তুলা  ৩৪৫০০  ১৮৮৮০০
পাহাড়ি তুলা        ১৭৫০০ ১৬২০০
মোট       ৫২০০০ ২০৫০০০
  
তুলা গবেষণায় চীনের রয়েছে অসামান্য সাফল্য। তাদের উৎপাদিত হাইব্রিড জাতের বিটি তুলা বালাই প্রতিরোধী জাত চাষ হচ্ছে সর্বত্র। তাদের রয়েছে অঙ্গজ ও শাখাবিহীন গাছ, ৯৫ দিনের স্বল্পমেয়াদি জাত, খরা ও লবণাক্তসহিষ্ণু বিটি তুলার জাত যা অবমুক্তির অপেক্ষায়। তাছাড়া যান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংগ্রহ করার জন্য করেছে O type অর্থাৎ শাখাবিহীন তুলার গাছ। তাছাড়া তাদের একর প্রতি ফলন অনেক বেশি ৫-৮ টন এবং সার ব্যবস্থাপনায় তাদের রয়েছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। সবমিলিয়ে আমরা যদি চীনের গবেষণা থেকে সরকারের মাধ্যমে  সহযোগিতা আনয়ন করতে পারি তবে আমাদের দেশে তুলা চাষের ঘটবে একটি বিপ্লব এবং দেশীয় অর্থনীতির ভীত হবে অত্যন্ত মজবুত।

ড. মো. তাসদিকুর রহমান*
* উপপরিচালক (সদর দপ্তর), তুলা উন্নয়ন বোর্ড, খামারবাড়ি, ঢাকা

Share with :

Facebook Facebook