About Ais

ভূট্টার রোগ ও তার প্রতিকার

ভূট্টার রোগ ও তার প্রতিকার

 

ড. কে, এম, খালেকুজ্জামান
উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা
উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ
আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র,
ঈশ্বরদী, পাবনা।
মোবাইলঃ ০১৫৫৮-৩১৩৬৩২

বাংলাদেশে ধান ও গমের পর ভূট্টা তৃতীয় ও উচ্চ ফলনশীল দানা জাতীয় ফসল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইহা বহুবিধ খাদ্য তৈরীতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে এবং কোন কোন দেশে ইহা প্রধান খাদ্য। কিন্তু বাংলাদেশে সাধারনতঃ পশু, মুরগী ও মৎস্য খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বিভিন্ন সমস্যার কারনে বাংলাদেশে ভূট্টার ফলন অনেক কম। তারমধ্যে রোগ একটা অন্যতম কারণ। বাংলাদেশে ভূট্টার মোট ২৮ টি রোগ সনাক্ত করা হয়েছে, তারমধ্যে ১৯ টি ছত্রাকজনিত, ১ টি ব্যাকটেরিয়াজনিত, ৩ টি ভাইরাসজনিত এবং ৫ টি কৃমিজনিত রোগ। ভূট্টার রোগ নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারলে ভূট্টার উৎপাদন অনেকাংশে বৃদ্ধি করা সম্ভব। ভূট্টার কয়েকটি প্রধান রোগ ও তাদের দমন ব্যবস্থা সম্পর্কে নিম্নে বর্নণা করা হল। 

১। রোগের নাম: বীজ পচা, মুল পচা  ও চারা ঝলসানো রোগ (Seed rot, root rot and seedling blight)  রোগের কারণঃ রাইজোকটোনিয়া (Rhizoctonia),  ফিউজারিয়াম (Fusarium),  সেস্ন্লারোসিয়াম (Sclerotium), পিথিয়াম (Pythium)  ইত্যাদি ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে।


রোগের লক্ষণঃ
১. বীজ বপনের পর পচে যায়।
২. চারা গজানোর পুর্বেই বীজের অংকুর মরে যায়।
৩. চারা ঝলসে যায়।
৪. গোড়া ও শিকড় পচে যায়।
৫. গজানো চারা চলে পড়ে ও মরে যায়।


প্রতিকারঃ
১. সুস্থ ও রোগমুক্ত বীজ বপন করতে হবে।
২. ফসল উঠার পর প্রখর রৌদ্রে (মার্চ-এপ্রিল মাসে) জমি চাষ করে ফেলে রাখতে হবে।
৩. উত্তমরুপে জমি চাষ ও পরিমিত রসে বীজ বপন করতে হবে, অর্থাৎ মাটিতে অধিক রস রাখা যাবে না।
৪. প্রোভেক্স বা ব্যভিষ্টিন প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে বীজ শোধন করে বপন করতে হবে।


২। রোগের নামঃ পাতা ঝলসানো রোগ (Leaf blight)


রোগের কারণঃ হেলমিনথোসপোরিয়াম টারসিকাম (Helminthosporium turcicum Syn. Bipolaris turcicum) নামক ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে।


রোগের লক্ষণঃ
১. গাছের নীচের দিকের পাতায় লম্বা, ডিম্বাকার ধুসর রংয়ের দাগ দেখা যায়। পরে আক্রানৱ দাগগুলো আকারে বড় হয়।
২. পরবর্তীতে গাছের উপরের অংশে বিস্তার লাভ করে।
৩. রোগের প্রকোপ  বেশী হলে গাছের আগা শুকিয়ে যায় ও গাছ মারা যায় যা অনেক সময় খরায় আক্রান্ত হয়েছে বলে মনে হয়।


প্রতিকারঃ
১. রোগ প্রতিরোধী জাত চাষ করতে হবে।
২. ফসল সংগ্রহের পর পাতা, কান্ড ইত্যাদি পুড়ে ফেলতে হবে।
৩. সুষম সার প্রয়োগ করতে হবে।
৪. প্রোভেক্স বা ব্যভিষ্টিন প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে বীজ শোধন করে বপন করতে হবে।
৫. রোগ দেখা দিলে আক্রান্ত ফসলে টিল্ট ২৫০ ইসি ১ লিটার পানিতে ০.৫ মিলি অথবা ব্যভিষ্টিন ১ লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর ৩ বার সেপ্র করতে হবে।

৩। রোগের নামঃ ডাউনি মিলডিউ (Downy mildew) রোগের কারণঃ  পেরোনোস্পোরা (Peronospora)  নামক ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে।


রোগের লক্ষণঃ
১. আক্রান্ত গাছ খর্বাকৃতি, দুর্বল ও বিবর্ণ হয়।
২. আক্রান্ত পাতায় লম্বা লম্বা সাদাটে দাগ পড়ে।
৩. আক্রান্ত পাতার নীচে সাদা ছত্রাক এবং ছত্রাকের বীজকনা দেখা যায়।
৪. পুর্ণ বয়স্ক গাছ আক্রান্ত হলে মোচার আকার ছোট হয় অথবা অনেক সময় মোচা পুরোপুরি হয় না। এ রকম লক্ষনকে ক্রেজি টপ বলে।


প্রতিকারঃ
১. রোগমুক্ত সুস্থ বীজ বপন করতে হবে।
২. আক্রান্ত গাছ দেখা মাত্র তুলে পুড়ে ফেলতে হবে।
৩. জমি থেকে অতিরিক্ত পানি নিস্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. রিভোমিল গোল্ড প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে বীজ শোধন করতে হবে।
৫. আক্রান্ত গাছে রিডোমিল গোল্ড প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে সেপ্র করতে হবে।

 


৪। রোগের নামঃ  পাতায় দাগ বা কারভুলারিয়া লিফ স্পট (Curvularia leaf spot)

রোগের কারণঃ কারভুলারিয়া (Curvularia lunata, C. maculans) নামক ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের লক্ষণঃ
১. প্রথমে ভুট্টার পাতায় ছোট ছোট গোল অথবা ডিম্বাকৃতির হলুদাভ দাগ পড়ে।
২. পরবর্তীতে এ দাগগুলো বাদামী রং ধারণ করে এবং আকারে বড়  হয়ে কখনো কখনো প্রায় ১ সেমি পর্যন্ত হয়ে থাকে।


প্রতিকারঃ
১. রোগমুক্ত বীজ সংগ্রহ করতে হবে।
২. ফসলের পরিত্যক্ত অংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
৩. টিল্ট ২৫০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে মিশিয়ে গাছে ১৫ দিন পর পর ৩ বার সেপ্র করতে হবে।


৫। রোগের নামঃ কাণ্ড পচা রোগ (Stalk rot)


রোগের কারণঃ ফিউজেরিয়াম (Fusarium),  ডিপেস্ললডিয়া (Diplodia),  পিথিয়াম  (Pythium), আরউইনিয়া (Erwinia),    সিওডোমোনাস (Pseudomonas)  ইত্যাদি দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে ।


রোগের লক্ষণঃ
১. কান্ডের নীচের দিকে নরম ও পানি ভেজা দাগ পড়ে।
২. শিলা বৃষ্টি বা শিকড় ক্ষত হলে আক্রমন বেড়ে যায়।
৩. আক্রমনে কাণ্ড পচে যায় এবং গাছ ভেঙ্গে পড়ে।


প্রতিকারঃ
১. সুস্থ ও সবল বীজ বপন করতে হবে।
২. সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার করতে হবে।
৩. ফসল কাটার পর আর্বজনা পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
৪. শস্য পর্যায় অনুসরন করতে হবে।
৫. শিকড় বা কাণ্ড আক্রমনকারী পোকা দমন করতে হবে।
৬. প্রোভেঙ বা ব্যভিষ্টিন প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে বীজ শোধন করে বপন করতে হবে।


৬। রোগের নামঃ মোচা ও দানা পচা রোগ (Ear rot/Cob and grain rot)


রোগের কারণঃ ডিপেস্ন্লাডিয়া (Diplodia), ফিউজারিয়াম (Fusarium), জিবেরেলা (Gibberella), পেনিসিলিয়াম (Penicillium),  এসপারজিলাস (Aspergillus)  ইত্যাদি ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে।


রোগের লক্ষণঃ
১. আক্রান্ত মোচার দানা বিবর্ণ হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবে পুষ্ট হয় না বা দানা কুচকে যায়।
২. দানার মাঝে বা উপরে অনেক সময় ছত্রাকের উপস্থিতি খালি চোখে দেখা যায়।
৩. প্রাথমিক অবস্থায় আক্রান্ত হলে পুরো মোচা ও দানা পচে যায়।


প্রতিকারঃ
১. দানা বা ঘাস জাতীয় শস্য বাদ দিয়ে শস্য পর্যায় অবলম্বন করতে হবে।
২. গাছের পরিত্যক্ত অংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
৩. পোকা ও পাখীর আক্রমন হতে দানা রৰা   করতে হবে।
৪. পরিপক্ক হওয়ার সাথে সাথে মোচা সংগ্রহ  করতে হবে।

৭। রোগের নামঃ পাভার ভাইরাস রোগ (Virus disease)


রোগের কারণঃ ভাইরাস দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে।


রোগের লক্ষণঃ

১. গাছের পাতার শিরা বরাবর সরু অথবা হলুদ দাগ দেখা যায়।
২. আক্রান্ত গাছ খর্বাকৃতির হয়।
৩. মোচা ছোট হয় এবং ফলন কমে যায়।


প্রতিকারঃ
১. আক্রান্ত গাছ উঠিয়ে পুড়ে ফেলতে হবে।
২. জমি আগাছা মুক্ত রাখতে হবে।
৩. দানাশস্য বাদ দিয়ে শস্য পর্যায় অবলম্বন করতে হবে।
৪. কর্ণ প্লান্ট হপার এ রোগ ছড়ায়। তাই পোকা দমনের জন্য অ্যাডমায়ার প্রতি লিটার পানি ০.৫ মিলি হারে মিশিয়ে সেপ্র করতে হবে।

৮। রোগের নামঃ গুদাম পচা রোগ (Storage disease) রোগের কারণঃ অ্যাসপারজিলাস (Aspergillus),  পেনিসিলিয়াম (Penicillium)  এবং রাইজোপাস (Rhizopus) নামক ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে।


রোগের লক্ষণঃ
১. মোচা বা দানা ভালভাবে না শুকিয়ে গুদামে রাখলে দানা পচে যায় ও বিবর্ণ হয়, দুর্গন্ধ বের হয় ও অংকুরোদগম ক্ষমতা কমে যায়।
২. দানায় বিষ তৈরী হয় যা মানুষ ও পশুর জন্য ক্ষতিকর।
৩. গুদামে পচন বেশি হলে ছত্রাকের উপস্থিতি খালি চোখে দেখা যায়।


প্রতিকারঃ
১. ভূট্টা পাকলে মোচা তাড়াতাড়ি সংগ্রহ করতে হবে ।
২. দানা ছড়ানোর সময় যেন ভেঙ্গে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
৩. দানা শুকিয়ে ১২% আর্দ্রতায় গুদামজাত করতে হবে।
৪. গুদামে পোকার আক্রমন রোধ করতে হবে।
৫. গুদামে তাপমাত্রা যেন না বাড়ে সে জন্য বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে।
৬. দানায় জলীয় অংশ কম রাখার জন্য বর্ষাকালে মাঝে মাঝে রোদ্রে শুকাতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন